পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন নারী ভোটাররা
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর। দুপুরের রোদে ব্যস্ত পথচারী, যানজট, দেয়ালজুড়ে নির্বাচনি পোস্টার আর ব্যানার। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঢাকা-১৫ আসনে এখন আলোচনা একটাই-এ আসনে কি সত্যিই লড়াই হতে যাচ্ছে?
রাজধানীর শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, কাফরুল ও মিরপুরের একাংশ নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৫ আসন। রাজনৈতিক সমীকরণ বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে এ আসনেও পাল্টে গেছে দৃশ্যপট। দীর্ঘদিনের মিত্র বিএনপি ও জামায়াত এবার সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী। এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রার্থী হয়েছেন। তাই এ আসন নিয়ে উৎসাহ ভোটারদের। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ডা. শফিকুর রহমান এ আসনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে (বিএনপির প্রতীক) ধানের শীষ নিয়ে লড়েছিলেন। এবার তিনি সরাসরি নিজ দলের প্রতীক ও প্রার্থী হওয়ায় জামায়াত নেতা-কর্মীদের মধ্যে বাড়তি উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। জামায়াতের স্থানীয় নেতারা জানান, দলের আমির দেশের বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনি সমাবেশ ও জাতীয় পর্যায়ের কর্মসূচিতে ব্যস্ত থাকলেও এ আসনের অধীন এলাকাগুলোতে নিয়মিত পথসভা ও উঠোন বৈঠক করছেন তাঁরা। অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী শফিকুল মিল্টন প্রায় প্রতিদিনই পাড়ামহল্লা চষে বেড়াচ্ছেন। রবিবার বিকালে কাফরুলের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে গণসংযোগ করেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। এ সময় তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ বলেন আমি এখানকার (স্থানীয়) লোক না। যারা এসব বলেন তারা কিন্তু থাকবে না আপনার পাশে। আমিই থাকব। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে ধনী-গরিব বৈষম্য মানবে না। রাজার ছেলে রাজা হবে এ সংস্কৃতি আমরা মানি না। রিকশাওয়ালার ছেলেও প্রধানমন্ত্রী হতে পারে, সেই সংস্কৃতি আমরা তৈরি করতে চাই।’ নির্বাচনে বিজয়ী হবেন-এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ধানের শীষের বিজয়ের বিষয়ে আমরা আশাবাদী। ঢাকা-১৫ আসনের জনগণ ব্যাপকভাবে সাড়া দিচ্ছে। আমার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী একটি দলের শীর্ষ নেতা। তাঁর সম্পর্কে আমি কোনো বিরূপ মন্তব্য করতে চাই না। তবে আমাদের দলের চেয়ারম্যান যেখানে সারা দেশ চষে বেড়াচ্ছেন এবং নারীসমাজের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তাদের উন্নয়নের পরিবেশ সৃষ্টি করছেন, সেখানে আরেকটি দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা হয়ে নারীসমাজকে অসম্মান করে কথা বলছেন। এটা ঠিক হয়নি।’
ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপি, জামায়াত ছাড়া আরও ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁরা হলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ডা. সাজেদুল হক রুবেল, জাতীয় পার্টির (জাপা) সামশুল হক, জনতার দলের খান শোয়েব আমান উল্লাহ, বাংলাদেশ জাসদের আশফাকুর রহমান, আমজনতার দলের নিলাভ পারভেজ এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির মোবারক হোসেন।
সরেজমিন দেখা গেছে, বিএনপির ধানের শীষ আর জামায়াতের দাঁড়িপাল্লার পোস্টার-ব্যানারেই ছেয়ে গেছে শেওড়াপাড়া থেকে মিরপুর-১০ পর্যন্ত পুরো সড়কের দুই পাশ। তবে চোখে পড়ে মিরপুর-১০ গোলচত্বরসহ বিভিন্ন এলাকায় সিপিবির কাস্তে প্রতীকের পোস্টার-ব্যানারও। কাস্তে প্রতীকের প্রার্থী ডা. সাজেদুল হক রুবেল নিয়মিত গণসংযোগও করছেন।
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ঢাকা-১৫ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫১ হাজার ৭১৮ জন। পুরুষ ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬১৬, নারী ১ লাখ ৭২ হাজার ৯৮ ও তৃতীয় লিঙ্গের ৪ জন। অর্থাৎ মোট ভোটারের প্রায় ৪৯ শতাংশ নারী। মাঠে কথা বলে বোঝা গেল, এই নারী ভোটাররাই ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।
কাজীপাড়ার স্থানীয় মুদি দোকানদার রাসেল মজুমদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এর আগেও জামায়াতের শফিক সাহেব বিএনপির ধানের শীষ নিয়ে দাঁড়িয়েছেন। তবে তিনি এখানকার স্থানীয় কেউ না। নির্বাচনে এটি একটা বড় ফ্যাক্টর। পারিবারিকভাবে আমরা বিএনপিকে সমর্থন করি। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও ধানের শীষে ভোট দিয়েছিলাম। এবারও ব্যতিক্রম হবে না।’
মিরপুর-১০ ফুটওভার ব্রিজের পাশে ফুল বিক্রি করেন কর্মজীবী নারী নাসরিন আক্তার। বাড়ি নরসিংদী হলেও কাফরুলের ভোটার তিনি। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই যেন নিরাপদে কাজ করতে পারি। চাঁদা না দিলে যেন কেউ উৎখাত না করে, হুমকিধমকি না দেয়। যে দল এ কথাগুলো বিশ্বাসযোগ্যভাবে বলবে, তাকেই ভোট দেব।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাজীপাড়ার এক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘এ আসনে লড়াই সহজ হবে না। একজন দলীয় প্রধান, অন্যজন বড় দলের প্রতীক। ভোট যদি সুষ্ঠু হয়, তাহলে লড়াই হবে। ফলাফল আগাম বলা কঠিন। কে নির্বাচিত হবেন তার জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’
