পুঁজিবাজারে আশাবাদ টেকসই করতে সাহসী সংস্কার চাই

আবু আহমেদ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রথম কার্যদিবসেই দেশের পুঁজিবাজারে যে বড় ধরনের উত্থান দেখা গেছে, তাকে এক কথায় ‘আশাবাদতাড়িত উল্লম্ফন’ বলা যেতে পারে। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ও দরপতনের পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এই যে প্রাণচাঞ্চল্য, তার মূলে রয়েছে একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশের প্রত্যাশা এবং নতুন সরকারের প্রতি আস্থা। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচক ও লেনদেনের এই চিত্র প্রমাণ করে যে আমাদের বাজার দীর্ঘদিন ধরে ‘আন্ডারভ্যালুড’ বা অবমূল্যায়িত অবস্থায় ছিল। এখন নতুন সরকার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে—এই খবরই বিনিয়োগকারীদের মনে বড় আশার সঞ্চার করেছে।

পুঁজিবাজার ও অর্থনীতির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। আর অর্থনীতি ভালো হলে তার ইতিবাচক প্রতিফলন পুঁজিবাজারে পড়বেই। তবে এই যে চাঙ্গাভাব আজ আমরা দেখছি, একে দীর্ঘ মেয়াদে ধরে রাখাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।

কেবল নির্বাচনী উদ্দীপনা দিয়ে বাজারকে বেশিদিন টেনে নেওয়া সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোর দৃশ্যমান উন্নতি।

প্রথমত, আমাদের সুদের হার কমিয়ে আনার দিকে নজর দিতে হবে। বিনিয়োগের খরচ কমলে এবং ঋণের প্রবাহ বাড়লে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসে, যার সুফল পায় পুঁজিবাজার। দ্বিতীয়ত, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি অন্তত সাড়ে ৬ শতাংশের ঘরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।

এই লক্ষ্য অর্জনে সরকারকে প্রয়োজনে কিছু ‘অজনপ্রিয়’ কিন্তু সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষ করে রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয়সাধন জরুরি।

পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে ভালো শেয়ারের জোগান দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকার এরই মধ্যে লাভজনক সরকারি কম্পানি ও নামি বহুজাতিক কম্পানিগুলোকে বাজারে আনার ব্যাপারে কিছু আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ নিয়েছে। নতুন সরকারকে এই উদ্যোগগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

বাজারে যখন মৌলভিত্তিসম্পন্ন ভালো শেয়ারের আধিক্য থাকবে, তখন কারসাজি বা কৃত্রিম সংকটের ভয় কমবে।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে পুঁজিবাজার সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা দ্রুত কার্যকর করতে হবে। বাজারের প্রতি সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের এই ফিরে আসা আস্থাকে টেকসই করতে হলে সুশাসন নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নীতি সহায়তা—এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে উঠতে পারে। আমরা আশা করি, বর্তমানের এই ‘বসন্তের বাতাস’ যেন কেবল সাময়িক উত্তাপ না হয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল বাজারের সূচনা করে।

লেখক : পুঁজিবাজার বিশ্লেষক এবং চেয়ারম্যান, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)

অনুলিখন : মাসুদ রুমী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights