পোড়া চিনির বর্জ্য দূষণে কর্ণফুলীতে ভেসে উঠছে মাছ

অনলাইন ডেস্ক

চট্টগ্রামে অপরিশোধিত চিনির পোড়া-গলিত বর্জ্য কারখানার ড্রেন দিয়ে সোজা কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে পড়ছে। এতে নদীর পানিতে বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশছে। এতে কর্ণফুলী নদীর বিভিন্ন রকম মাছ ও জলজ প্রাণী ভেসে উঠতে শুরু করেছে।

এদিকে, বুধবার সকাল থেকে নদীর দুই তীরে মাছ ভেসে উঠতে দেখে কয়েকশ মানুষ মাছ ধরতে নেমে পড়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পোড়া চিনির বর্জ্যের কারণে নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে গেছে। সে কারণে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন না পেয়ে মাছ ও বিভিন্ন জলজ প্রাণী ভেসে উঠছে। বছরের পর বছর ধরে নানা রকম দূষণের কারণে গত এক দশক ধরে কর্ণফুলীতে বড় আকারের মাছ আর তেমন নেই। ছোট যে কয়েক প্রজাতির মাছ প্রতিকূল এই পরিবেশে টিকে আছে, সেগুলোও চিনি পোড়া রাসায়নিক দূষণে নিঃশেষ হতে বসেছে।
নদীর দক্ষিণ পাড়ে কণর্ফুলী উপজেলার চরপাথরঘাটা ইউনিয়নে এস আলম সুগার রিফাইনারি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কারখানা। কারখানার সীমানার মধ্যেই পাঁচটি গুদাম। যার একটিতে পরিশোধিত চিনি এবং বাকি চারটি গুদামে অপরিশোধিত চিনি রাখা হয়।

নদীর এ অংশের ঠিক বিপরীতে এস আলমের চিনি কলের গুদামে সোমবার আগুন লাগার পর পোড়া অপরিশোধিত চিনি ফেলা হয় নদীতে। এরপর মঙ্গলবার বিকেল থেকে নদীর দুই তীর ঘেষে মাছ ভেসে উঠতে দেখা যাচ্ছে।

সোমবার বিকাল চারটার দিকে যখন ১ নম্বর গুদামে আগুন লাগে তখন সেটিতে ১ লাখ টনসহ চারটি গুদামে মোট চার লাখ টন অপরিশোধিত চিনি ছিল বলে এস আলম গ্রুপের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সোমবার বিকেল থেকে রাতভর চেষ্টা করে আগুন নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলেও পুরোপুরি নির্বাপন করা যায়নি। বুধবার দুপুরেও গুদামে আগুন জ্বলছিল।

মঙ্গলবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত কারখানায় থেকে দেখা যায়, আগুন লাগা গুদাম থেকে গলে যাওয়া অপরিশোধিত চিনি পার্শ্ববর্তী কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে পড়ছে। এসব বর্জ্য মিশে নদীর পানির মান কমে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবেশগত প্রভাব পড়ার শঙ্কার কথা মঙ্গলবারই প্রকাশ করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা।

সেই আশঙ্কা সত্যি হতে শুরু করে মঙ্গলবার বিকাল থেকেই। তখন থেকেই নদীর দুই তীরে মাছ ভাসতে শুরু করে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

এস আলম সুগার মিল নদীর যে পাশে অবস্থিত, সেই দক্ষিণ পাড়ে বুধবার সকালেও মাছ ভাসতে দেখা যায়। পাশাপাশি নদীর উত্তর পাড়ে নগরীর অংশেও তীর ঘেষে মাছ ভাসতে দেখা যায় সকাল থেকে।

স্থানীয় লোকজন তখন নদীর উত্তর পাড়ে ফিশারিঘাট ও ব্রিজঘাট এলাকায় এবং দক্ষিণ পাড়ে চর পাথরঘাটার বাংলাবাজার অংশে মাছ ধরতে নেমে পড়ে। তাদের টানা জাল ও নেটে চিংড়ি, গুলশা, টেংরা, বাইন মাছের পাশাপাশি কাঁকড়া ও বিভিন্ন জলজ প্রাণী উঠে আসে। নদীর তীরের কাছে এসব মাছ ভাসতে এবং তীরের কাদায় আটকে থাকতে দেখা যায়। অনেকে খালি হাতেও মাছ ধরেন।

পোড়া চিনির বর্জ্যে নদীর দক্ষিণ পাড়ে বাংলাবাজার খাল ও ঘাট সংলগ্ন অংশের পানি ঘোলাটে বাদামি রঙ ধারণ করেছে।

স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, “নদীর পানিতে সুগার মিলের পোড়া কেমিকেল পড়ায় মাছ নিঃশ্বাস নিতে না পেরে ভেসে উঠেছে। মাছ পাওয়ার কথা শুনে শত শত লোকজন নদীতে নেমে পড়েছে।

“শুরুতে বড় টেংরা, বড় চিংড়ি ও কাঁকড়া পেয়েছে। দুপুরের দিকে ছোট সাইজের মাছ পাচ্ছে। বেশিরভাগই জীবিত মাছ। কিছু মাছ পানির উপরের দিকে কিছুক্ষণ ভেসে আবার ডুব দিচ্ছে। ভাসার সময় হাত দিয়েও মাছ ধরা যাচ্ছে।”

পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের পরীক্ষাগারের চিফ কেমিস্ট কামরুল আলম বলেন, গতকালই আমরা পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠিয়েছি। নদীর পানিতে ডিও (দ্রবীভূত অক্সিজেন) কমে গেছে। মানমাত্রা যেখানে ৫ থাকার কথা সেটা কমে গতকাল ছিল ১। চিনি পুড়ে কার্বন ডাই-অক্সাইড হয়েছে, সেসব পোড়া অংশ পানিতে এসে পড়ায় পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেছে।

মাছ ভেসে ওঠার বিষয়টি জানার পর পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি টিম পানির মান জানতে কাজ করছে বলে জানান তিনি।

চট্টগ্রামের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শ্রীবাস চন্দ্র চন্দ বলেন, “আমাদের একটি দল নদীর পানির ফিজিক্যাল ও কেমিকেল কমপোনেন্টের টেস্ট করছে। পানিতে অক্সিজেন স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। দ্রবীভূত অক্সিজেন দ্রুত কমে যাচ্ছে।”

তিনি বলেন, দূষণের কারণে কর্ণফুলীতে এমনিতে বড় কোনো মাছ এখন আর দেখা যায় না। কয়েক বছর আগেও আইড় জাতীয় বিভিন্ন মাছ মিলত, সেগুলোও এখন আর নেই। নদীতে এখন শুধু গুলশা, টেংরা, চিংড়ি আর কাঁকড়া টিকে আছে। সেগুলোও অক্সিজেন না পেয়ে ভেসে উঠছে। সেগুলো নদীর পাড়ের মানুষ ধরছে। এই অবস্থায় পানির মান স্বাভাবিক হওয়ার জন্য জোয়ার-ভাটার দিকে তাকিয়ে আছেন এই সরকারি কর্মকর্তা।

জোয়ার এলে নদীর পানিতে মেশা রাসায়নিকের পরিমাণ হয়ত কিছুটা কমবে। তখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে। সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights