প্যারাগুয়ে সিনেটরের গালি-হুমকির মাঝেও মরক্কো ম্যাচেই চোখ এমবাপ্পের

অনলাইন ডেস্ক
প্যারাগুয়ের সিনেটর সেলেস্তে আমারিল্লার বর্ণবাদী ও ব্যক্তিগত আক্রমণ যেন থামছেই না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তির পর এবার সংসদেও দাঁড়িয়ে ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ‘শুয়োরের বাচ্চা’ বলে গালি দিয়েছেন তিনি। এমনকি এমবাপ্পেকে জেলে পাঠানোর হুমকিও দিয়েছেন। তবে ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম জানিয়েছেন, এসব বিতর্কে মোটেও বিচলিত নন এমবাপ্পে। মরক্কোর বিপক্ষে কোয়ার্টার-ফাইনাল নিয়েই তার পুরো মনোযোগ।

বিতর্কের সূত্রপাত রাউন্ড অব ৩২-এ ফ্রান্স-প্যারাগুয়ে ম্যাচের পর। এমবাপ্পের পেনাল্টি গোলে ১-০ ব্যবধানে জেতে ফ্রান্স। ম্যাচ শেষে প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলের সঙ্গে এমবাপ্পের কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে গিল করমর্দনের জন্য হাত বাড়ালেও তা প্রত্যাখ্যান করেন ফরাসি অধিনায়ক।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্যারাগুয়ের বিরোধী দল লিবারেল পার্টির সিনেটর সেলেস্তে আমারিল্লা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এমবাপ্পের আফ্রিকান বংশোদ্ভূত পরিচয় টেনে একের পর এক বর্ণবাদী মন্তব্য করেন। তিনি এমবাপ্পেকে ‘ঔপনিবেশিক ক্যামেরুনীয়’, ‘বর্বর’, ‘অহংকারী’, ‘কুৎসিত’ ও ‘হঠাৎ বড়লোক’ বলে আখ্যা দেন। এমনকি দাবি করেন, প্যারাগুয়ের খেলোয়াড়দের ম্যাচ শেষে এমবাপ্পেকে চড় মারা উচিত ছিল।

এর জবাবে এমবাপ্পেও কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি আমারিল্লাকে ‘ঘৃণ্য নারী’ ও ‘পদের অযোগ্য’ উল্লেখ করে লেখেন, “আপনি প্যারাগুয়ের প্রতিনিধিত্ব করেন না। এই বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ের ফুটবলাররা যে সম্মান ও লড়াকু মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে, আপনার বর্ণবাদী মন্তব্য তা ম্লান করে দিয়েছে। আপনার মতো কাউকে আমি ঘৃণা ও বর্ণবাদ ছড়ানোর সুযোগ দেব না।”

এমবাপ্পের এই জবাবের পর আমারিল্লা দাবি করেন, তাকে ‘ঘৃণ্য নারী’ বলায় এমবাপ্পে লিঙ্গভিত্তিক ও রাজনৈতিক সহিংসতা করেছেন। তিনি প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে না নিলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও হুমকি দেন। পরে নিজের বর্ণবাদী পোস্ট মুছে ফেললেও বিতর্ক থামাননি তিনি।

বরং বুধবার প্যারাগুয়ের সংসদে দাঁড়িয়ে আবারও এমবাপ্পেকে লক্ষ্য করে কটূক্তি করেন আমারিল্লা। তিনি বলেন, “অরল্যান্ডো গিল প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলছিল। একজন প্যারাগুয়েনের বিনয়ের সঙ্গে সে হাত বাড়িয়েছিল, আর এই শুয়োরের বাচ্চা তার সঙ্গে হাত মেলাতে অস্বীকৃতি জানায়। এটা ফরাসি আচরণ নয়।”

ফ্রান্সের ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, “ফ্রান্স মানে রুশো, দেকার্ত, মন্তেস্কু, ভিক্টর হুগো ও সিমোন দ্য বোভোয়ারের দেশ। এমবাপ্পের মতো একজনের সঙ্গে সেই ফ্রান্সকে আমি কখনো এক কাতারে ফেলতে পারি না।”

একই সঙ্গে ২০২০ সালে প্যারাগুয়েতে ব্রাজিল কিংবদন্তি রোনালদিনহোর কারাবাসের প্রসঙ্গ তুলে এমবাপ্পেকে সতর্ক করে তিনি বলেন, “প্যারাগুয়েনদের হালকাভাবে নিও না। আমরা রোনালদিনহোকেও জেলে পাঠিয়েছিলাম। প্রয়োজন হলে তোমার বিরুদ্ধেও মামলা করব।”

তবে এসব বিতর্কে এমবাপ্পের মনোযোগ নষ্ট হয়নি বলে জানিয়েছেন ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম। মরক্কোর বিপক্ষে কোয়ার্টার-ফাইনালের আগে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “কিলিয়ান মানসিকভাবে খুব ভালো অবস্থায় আছে। সে পুরোপুরি ম্যাচের দিকেই মনোযোগী এবং খেলার জন্য প্রস্তুত।”

এদিকে সিনেটরের মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন (এফএফএফ)। সংস্থাটি ঘটনাটিকে বর্ণবাদী ও অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দিয়ে আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এবং প্যারাগুয়ে সরকারও প্রকাশ্যে এমবাপ্পের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। প্যারাগুয়ে সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, আমারিল্লার বক্তব্য তার ব্যক্তিগত মতামত; এটি রাষ্ট্র বা জাতীয় কংগ্রেসের অবস্থান নয়।

চলতি বিশ্বকাপে ইতোমধ্যে সাত গোল করা এমবাপ্পে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও এগিয়ে আছেন। মাঠের বাইরের বিতর্ক পেছনে ফেলে মরক্কোর বিপক্ষে ফ্রান্সকে সেমিফাইনালে তুলতে এখন তার দিকেই তাকিয়ে সমর্থকরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights