প্রতিবাদে উত্তাল ফ্রান্স, রাস্তায় ৬ লাখ মানুষ
অনলাইন ডেস্ক
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়া এবং জীবনযাত্রার ব্যয় চরম মাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত হয়েছে গত কয়েক বছরের মধ্যে বৃহত্তম প্রতিবাদ বিক্ষোভ ও ধর্মঘট। দেশজুড়ে চলা ধর্মঘটের সাথে তাল মিলিয়ে আয়োজিত এই বিক্ষোভে বৃহস্পতিবার সরকারের হিসেবেই প্রায় ৫ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ অংশ নেন।
গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে যে মাত্রায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল, তার তুলনায় বৃহস্পতিবারের পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত ছিল। তবে বেশ কিছু প্রধান নগরীতে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে স্থানীয়ভাবে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। ধর্মঘটের ফলে দেশটির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, রেল পরিষেবা এবং আংশিকভাবে হাসপাতাল কার্যক্রম ব্যাহত ও কর্মীশূন্য হয়ে পড়ে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভালো পরিবেশের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন এবং ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনকারীরা এক হয়ে এ বিক্ষোভে যোগ দেওয়ায় আন্দোলনের ব্যাপকতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও প্রতিটি গোষ্ঠীর নির্দিষ্ট কিছু দাবি রয়েছে, তবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারের নিষ্ক্রিয়তা, ক্রমবর্ধমান ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য এবং দেশটিতে একটি আমূল সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা সবাইকে একসূত্রে গেঁথেছে।
শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ডাকসেবা কর্মী থেকে শুরু করে চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট এবং পরিবহন কর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী ফ্রান্সের বৃহত্তম ইউনিয়নগুলো বৃহস্পতিবারের দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দেয়। সরকারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর এক-তৃতীয়াংশ এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দেশের প্রায় ১৩ শতাংশ বিদ্যালয় কর্মী ধর্মঘটে যোগ দেন, যদিও ইউনিয়নগুলোর দাবি অনুযায়ী এই সংখ্যা আরো অনেক বেশি।
রেল পরিষেবাতেও কর্মীদের কর্মবিরতির কারণে ব্যাপক শিডিউল বিপর্যয় ঘটে। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালের মাত্র ৫ শতাংশ কর্মী এতে অংশ নেওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা খাতে কোনো বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেনি।
প্রায় তিন সপ্তাহ আগের বিক্ষোভগুলোতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই ফ্রান্সের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ব্যবসায়ীরা প্রতিটি বিক্ষোভ নিয়ে চরম সতর্ক অবস্থায় ছিলেন। রেন, নান্টেস, লিঁও এবং মার্সেই শহরগুলোতে চরমপন্থী ও অতি-বামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের ঘটনা ঘটলেও সার্বিকভাবে দিনটি বড় কোনো অঘটন ছাড়াই পার হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এসব সহিংসতা ও সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ সারা দেশে মোট ৪৪৮ জনকে আটক করেছে।
লিঁও শহরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের হটাতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে। অন্যদিকে রেন শহরে কয়েক ডজন বিশৃঙ্খলাকারী একটি হোটেলে ভাঙচুর চালায়, পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছোড়ে এবং শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদরত ইউনিয়ন সদস্যদের ওপর সহিংস হামলা চালায়। শিক্ষা মন্ত্রী এদুয়াঁদ গেফ্রে জানিয়েছেন, তুলুজের কাছে একটি বিদ্যালয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যা পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগ বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা অন্তত ৮৬টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সাড়া দিয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাকে সমর্থন জানিয়ে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ বলেন, “সহিংসতার নানামুখী চেষ্টার মধ্যেও পুলিশ সদস্যরা চরম সাহস ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন, যাতে নাগরিকরা শান্তিতে ও নিরাপদে তাদের প্রতিবাদের অধিকার চর্চা করতে পারেন।”
আন্দোলনে অংশ নেওয়া প্রতিটি পক্ষের দাবি ভিন্ন ভিন্ন। ধর্মঘটের ডাক দেওয়া প্রধান শ্রম ইউনিয়নগুলো বেতন এবং পেনশন বৃদ্ধির দাবি জানাচ্ছে। বিশেষ করে ফ্রান্সের প্রভাবশালী ইউনিয়ন সিজিটি অবিলম্বে ন্যূনতম মজুরি ১০ শতাংশ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে, আর সিএফডিটি তাদের কর্মীদের জন্য মাসিক সর্বনিম্নে ১০০ ইউরো (প্রায় ৭ শতাংশ) মজুরি বৃদ্ধির দাবি করছে।
শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো বাজেটে শিক্ষা খাতে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নে ১.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিরিক্ত ২ লাখ ৫০ হাজার আসন সৃষ্টির জোর দাবি জানিয়েছে।
অন্যদিকে আট বছর আগে উদ্ভূত চরমপন্থী আন্দোলন ‘ইয়েলো ভেস্ট’ সরাসরি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও তার সরকারের পদত্যাগ এবং নতুন সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরুর একদফা দাবি তুলে ধরেছে।
দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন অব্যাহত রাখার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। আগামী বড়দিন এবং এমনকি আগামী বসন্তে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত এই অসন্তোষ ও রাজপথের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সামনের দিনগুলোতেও ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীরা ধারাবাহিক বিক্ষোভের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ফ্রান্সে শুরু হওয়া এই গণজাগরণের ঢেউ ইউরোপের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়ছে; স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল ও বেলজিয়ামেও চলতি মাসের শেষের দিকে একই ধরণের বড় ধর্মঘটের পরিকল্পনা রয়েছে।
গত ১৭ অক্টোবরের আকস্মিক সহিংসতায় থমকে যাওয়া ফরাসি কর্তৃপক্ষ এবার সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাস্তায় কড়া পাহারা দিয়ে সহিংসতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হলেও, প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ জনগণের যৌক্তিক দাবিগুলো সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
ফরাসি সাংবাদিক ও ইউটিউবার উগোদেক্রিপ্ট-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ বলেন, আমি চাই ছুটির পর যেন সব হাইস্কুল খুলতে পারে। কারণ আমাদের তরুণদের ভবিষ্যতের প্রশ্ন জড়িত, তাদের ক্লাসে ফিরে আসা প্রয়োজন। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, তরুণদের দাবিগুলো সরকার ইতোমধ্যে শুনেছে এবং তিনি বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অন্তত হাইস্কুলগুলো স্বাভাবিকভাবে চালুর জন্য শান্ত থাকার আবেদন জানান।
সূত্র: সিএনএন
