প্রথম দিনেই ট্রাম্পতাণ্ডব

যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি
দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়ে হোয়াইট হাউসে ফিরেই ‘অ্যাকশন’ শুরু করে দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের দিনই বেশ কিছু নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন তিনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব প্রোগাম বাতিল, ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ক্যাপিটল হিলে হামলার সঙ্গে জড়িতদের ক্ষমা প্রদান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হু এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাম প্রত্যাহার। এ ছাড়া সরকারের চারজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছেন তিনি। আরও ১ হাজারের মতো ফেডারেল কর্মকর্তাকে বরখাস্তের হুমকি দিয়েছেন। সরকারি কর্মকর্তাদের বরখাস্তের কথা অভিষেকের পর ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফরমে প্রথম পোস্টে জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে হোয়াইট হাউস থেকে বিবৃতি দিয়েও কয়েকটি বিষয়ে নতুন প্রেসিডেন্টের তরফে নির্বাহী আদেশ জারির বিষয়ে জানানো হয়েছে। এসব নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরেই এক প্রকার ঝড় শুরু করেছেন রিপাবলিকান দলীয় ট্রাম্প।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০ জানুয়ারি সকালে শপথ নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করেই কাজে নেমে পড়েন ট্রাম্প। দ্বিতীয় মেয়াদের ক্ষমতা গ্রহণের দিন সন্ধ্যায় ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে জনপ্রিয় ও বিতর্কিত নাগরিকত্ব প্রোগ্রামের বিলুপ্তি ঘটান। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অবৈধ অভিবাসীদের গর্ভে জন্ম নেওয়া শিশুরাও সিটিজেনশিপ পাবে না। এমনকি যারা নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে সন্তান জন্ম দেবেন তাদের সে সন্তানরাও দেশটির নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হবে না। এখানে উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রদত্ত এ সুযোগ কেড়ে নেওয়ার আদেশ চ্যালেঞ্জ করে শিগগিরই মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার নিয়ে কর্মরত সংগঠনগুলো উচ্চ আদালতে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে। উচ্চতর আদালত যদি আটকে না দেয় তাহলে ট্রাম্পের এ আদেশ আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের চতুর্দশতম সংশোধনী অনুযায়ী, দেশটিতে জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশু স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেখানকার সিটিজেনশিপ পেয়ে আসছে। তবে বেশ কয়েক দশক আগে থেকে সিটিজেনশিপ প্রদানের প্রক্রিয়া নিয়ে আইনগত লড়াইয়ের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরাও নানা মতামত দিয়েছেন। সংশোধনীর ভাগ্য নির্ধারণে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় ট্রাম্পের এ সংক্রান্ত নির্বাহী আদেশ কতটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে তা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।

চার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত : ফেডারেল সরকারের চারজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বরখাস্তের কথা জানিয়ে ট্রাম্প তাঁর সোশ্যাল পোস্টে লিখেন, আগের প্রশাসনের নিয়োগ দেওয়া ১ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে চিহ্নিত ও অপসারণের লক্ষ্যে সক্রিয় প্রক্রিয়া চলমান। আমেরিকাকে আবার মহান করে তোলার বিষয়ে তাঁর যে দৃষ্টিভঙ্গি, তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নন এ ব্যক্তিরা। বরখাস্ত হওয়া চারজন হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের খেলাধুলা, স্বাস্থ্য-সবলতা ও পুষ্টিবিষয়ক পরিষদের হোসে আন্দ্রেজ, জাতীয় অবকাঠামো উপদেষ্টা পরিষদের মার্ক মিলে, উইলসন সেন্টার ফর স্কলারসের ব্রায়ান হুক ও রপ্তানিবিষয়ক পরিষদের কেইশা ল্যান্স বটমস। এখানে উল্লেখ্য, নির্বাচনি প্রচারের সময় ট্রাম্প সরকারি ব্যয় সংকোচন, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের জনবল কমানোর পাশাপাশি সরকারি কাজে দক্ষতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এ প্রতিশ্রুতি যদি পুরোপুরি পালন করা শুরু করেন তিনি তাহলে আগামী সপ্তাহ ও মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।

ডব্লিউএইচও থেকে প্রত্যাহার : জাতিসংঘের বিশেষ সংস্থা ‘হু’ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন নতুন প্রেসিডেন্ট। শপথ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই এ সংক্রান্ত নির্বাহী আদেশ জারি করেন তিনি। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর দিনই হু থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারে দ্রুত পদক্ষেপ নেন ট্রাম্প। এটি এমন একটি পদক্ষেপ যা বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য খাতের নেতৃত্বস্থানীয় দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে দুর্বল করবে এবং পরবর্তী মহামারির বিরুদ্ধে লড়াই করা আরও কঠিন করে তুলবে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সহায়তা সাময়িক বন্ধ ঘোষণা : নতুন প্রেসিডেন্ট আগামী ৯০ দিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের বৈদেশিক সহায়তা কর্মসূচি বন্ধ করে দিয়েছেন। শপথের দিনই এক নির্বাহী আদেশ জারির মাধ্যমে এ সহায়তা কর্মসূচি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেন ট্রাম্প। তবে বৈদেশিক সহায়তা বন্ধের আদেশ মার্কিন তহবিলের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে তা পরিষ্কার নয়। কারণ দেশটির অনেক কর্মসূচি ইতোমধ্যে কংগ্রেসে তহবিল বরাদ্দ পেয়েছে। আর এসব অর্থ ইতোমধ্যে বিতরণ অথবা ব্যয় করা হয়েছে।

টাইমস স্কয়ারে প্রবাসীদের আনন্দ সমাবেশ : ট্রাম্পের ফের ক্ষমতায় ফেরার দিন অপরাহ্ণে নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে ‘অবতার ট্রাম্প’ ব্যানার হাতে আনন্দ-সমাবেশ করেছে প্রবাসী বাঙালিরা। কনকনে শীত উপেক্ষা করে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি এ সমাবেশে অংশ নেন। এ সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘায়ু কামনা করা হয়। সমাবেশের আয়োজকদের অন্যতম ইঞ্জিনিয়ার নির্মল পাল বলেন, আমেরিকাকে দুর্বৃত্তদের কবল থেকে রক্ষার জন্যই ট্রাম্পের জন্ম হয়েছে। এ কারণেই ট্রাম্প ফের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট আশরাফুল হাসান বুলবুলের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা রথীন্দ্রনাথ রায়, কমিউনিটি লিডার শরাফ সরকার, টুটুল চৌধুরী, দিনেশ মজুমদার, ফুয়াদ আহমেদ, ভজন সরকার, উত্তম সাহা, ইসমাইল খান আনসারী, আল আমিন বাবু প্রমুখ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights