প্রশাসনের প্রশ্রয়ে নিষিদ্ধ উপত্যকা

মুহাম্মদ সেলিম, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম শহরতলিতেই অবস্থান কুখ্যাত সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য সলিমপুরের। এখানে পা রাখলেই মনে হবে এটি বাংলাদেশের মানচিত্রের বাইরের কোনো এক নিষিদ্ধ উপত্যকা। প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে কীভাবে একটি এলাকা ‘রাষ্ট্রের ভিতরে আরেক রাষ্ট্র’ হয়ে উঠল অনুসন্ধানে উঠে এসেছে জঙ্গল সলিমপুরের ভিতরের অজানা ও শিউরে ওঠা সব তথ্য।

নিষিদ্ধ এ উপত্যকায় কার্যকর নেই রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন। সংবিধান বা প্রশাসনের কোনো অস্তিত্ব নেই এই পাহাড়ি জনপদে; বরং এখানে বুক ফুলিয়ে চলে গডফাদারদের নিজস্ব শাসনব্যবস্থা। দিনের আলোতে বাইরে থেকে এটি ছিন্নমূল মানুষের বিশাল বস্তি মনে হলেও রাতের আঁধারে জঙ্গল সলিমপুর হয়ে ওঠে এক ভয়ংকর অপরাধ সাম্রাজ্য। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-এ সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর কাছে কার্যত অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনেরই কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশ মোটা অঙ্কের মাসোহারার বিনিময়ে গডফাদারদের এই অবৈধ সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহায়তা করে চলেছে। প্রশাসনের সঙ্গে সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর গোপন যোগাযোগের তথ্য উঠে এসেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কথায়ও। গত রবিবার জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শন শেষে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গত মার্চ মাসে এখানে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনীর সমর্থন নিয়ে আমরা একটা ব্যাপক তল্লাশি অভিযান চালাই। তবে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আমরা সেটা করতে পারিনি, কারণ কোনো না কোনো কারণে হয়তো এ তথ্যগুলো ফাঁস হয়ে যাওয়ার কারণে তারা আগে থেকে সাবধান হয়ে গিয়েছিল।’ স্থানীয় কয়েকজন অভিযোগ করেন-সীতাকুণ্ড ও নগরীর বায়েজিদ থানার কতিপয় সদস্যের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের গোপন আঁতাত রয়েছে।

সন্ত্রাসীদের টোল ও করব্যবস্থা : জঙ্গল সলিমপুরে রাষ্ট্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজস্ব টোল ও করব্যবস্থা চালু করেছে সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো। ওই এলাকার গডফাদার ইয়াসিন মিয়া, কাজী মশিউর রহমান, লাল বাদশা, ফারুক, গফুর মেম্বার, গাজী সাদেক ও রোকন উদ্দিন মেম্বারের বাহিনীর সদস্যরা এসব টোল আদায় করে। সেখানে একেকটি প্লট কিনতে কথিত সমিতিকে ৫০ হাজার থেকে শুরু করে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। একইভাবে প্লট বিক্রেতাকেও সমপরিমাণ চাঁদা দিতে হয়। এ ছাড়া নতুন ঘর নির্মাণ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালু, এমনকি এলাকায় সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও চলাচলের জন্যও কথিত তিন সমিতির নির্ধারিত চাঁদা দেওয়া বাধ্যতামূলক।

অস্ত্র-মাদকের ভাগাড় : বাইরে থেকে সাধারণ বস্তি মনে হলেও জঙ্গল সলিমপুরের ভিতরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন ও ভয়াবহ। পাহাড় ও খাসজমি দখলের পাশাপাশি দুর্গম এ এলাকাটি এখন বৃহত্তর চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। শতকোটি টাকার প্লটবাণিজ্য ও আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে পাহাড়ের গহিনে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ অস্ত্রের বিশাল মজুত। সিন্ডিকেটগুলোর নিজস্ব সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীর ভান্ডারে রয়েছে একে-৪৭, বিদেশি পিস্তল, শটগানসহ বিপুল পরিমাণ দেশিবিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র। প্রায়ই গভীর রাতে ফাঁকা গুলি ছুড়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গোলাগুলির ঘটনা এখানে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগ নিয়ে সংঘবদ্ধ চক্র এলাকাটিকে মাদকের বিশাল গুদাম ও ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করছে। সীমান্ত থেকে আসা ইয়াবা, ফেনসিডিল ও ভয়ংকর মাদক ‘আইস’-এর বড় চালান প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রথমে এখানে মজুত করা হয়। পরে নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। এমনকি সিন্ডিকেটের ভয়ে স্থানীয় নিম্ন আয়ের মানুষ বাধ্য হচ্ছে মাদক কারবারে ক্যারিয়ার হিসেবে কাজ করতে।

দুুর্ধর্ষ অপরাধীদের ‘সেফ জোন’ : জঙ্গল সলিমপুরের এ অন্ধকার সাম্রাজ্যে বাইরের মানুষের প্রবেশাধিকার অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত। অপরিচিত কেউ সেখানে প্রবেশ করলেই পাহাড়ের বিভিন্ন পয়েন্টে পাহারায় থাকা সিন্ডিকেটের সোর্সদের মাধ্যমে খবর পৌঁছে যায় গডফাদারদের কাছে। এই দুর্ভেদ্য নিরাপত্তার কারণে খুন, ডাকাতি, ছিনতাই ও মাদক মামলার পলাতক আসামিরা টাকার বিনিময়ে এখানে নিরাপদ আশ্রয় কিনে নেয়। নির্দিষ্ট অঙ্কের মাসিক চাঁদা দিলে এ পাহাড়ের ভিতর তাদের গায়ে হাত দেওয়ার সাহস কেউ দেখায় না। এক কথায়, এটি এখন অপরাধীদের একটি অঘোষিত ‘সেফ জোন।

অপরাধীদের আইনে চলে বিচার : দেশের প্রচলিত আইন নয়, জঙ্গল সলিমপুরের গহিনে চলে অপরাধীদের নিজস্ব ‘আইন’। থানা বা আদালতের কোনো অস্তিত্ব সেখানে নেই; পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ গডফাদারদের হাতে। যেকোনো বিরোধ মেটাতে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে এক সমান্তরাল প্রশাসন, যার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো গডফাদারদের পরিচালিত ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ ও গোপন টর্চার সেল। আলীনগর ও ছিন্নমূল অংশে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ কোনো সমস্যায় পড়লে রাষ্ট্রের দ্বারস্থ হতে পারেন না। থানায় অভিযোগ করা সেখানে অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ। জমিজমা, অর্থ লেনদেন থেকে পারিবারিক কলহ সবকিছুর ফয়সালা হয় স্বঘোষিত রাজা বা বাহিনী প্রধানদের কথায়। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের কোনো সুযোগ নেই।

কেউ মুখ খুললে বা রায় না মানলে গোপন টর্চার সেলে আটকে চালানো হয় মধ্যযুগীয় বর্বরতা। হাত-পা ভেঙে দেওয়া, পাহাড় থেকে ফেলে দেওয়া বা গুম করার মতো ঘটনা সেখানে নিত্যনৈমিত্তিক। মূলত এই বিচারব্যবস্থা চাঁদাবাজির অন্যতম হাতিয়ার। বিরোধ নিষ্পত্তির নামে উভয় পক্ষের কাছ থেকেই মোটা অঙ্কের জরিমানা আদায় করা হয়। টাকা দিতে ব্যর্থ হলে ওই ব্যক্তির বসতবাড়ি বা প্লট কেড়ে নিয়ে নতুন করে অন্যের কাছে বিক্রি করে দেয় সিন্ডিকেট। বিচারের নামে নিরীহ মানুষের সর্বস্ব লুটে নেওয়ার এক সুপরিকল্পিত ফাঁদ এই প্রশাসন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights