প্রহসনের নির্বাচনের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন খালেদা জিয়া
অনলাইন ডেস্ক
২০১১ সালের নভেম্বর, বেগম খালেদা জিয়া তখন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা, সেই সময় বাংলাদেশ প্রতিদিনকে একটি একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন তিনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের মতো তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের একতরফা সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘গণবিচ্ছিন্ন সরকার (তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার) মানুষের ভোটাধিকার হরণ করতে চায় বলেই একতরফা সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছে।’ সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন শফিউল আলম দোলন, যা নভেম্বরের ১৯ তারিখ (২০১১) প্রকাশিত হয়। বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রয়াণে সাক্ষাৎকারটি পুনঃপ্রকাশ করা হলো।
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ব্যর্থ সরকারের দুর্নীতি, দুঃশাসন ও জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে রায় দিতে তারা প্রস্তুত। এখন শুধু চায়, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। জাতীয় নির্বাচনে জনগণ ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলে বিএনপিকেই নির্বাচিত করবে। আমরা রোডমার্চ-জনসভা যেখানেই যাচ্ছি সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা জানিয়ে মানুষ সেখানেই আমাদের পক্ষে অভূতপূর্ব সাড়া দিচ্ছে। গণবিচ্ছিন্ন সরকার মানুষের ভোটাধিকার হরণ করতে চায় বলেই একতরফা সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছে। কিন্তু জনগণ আন্দোলনের পথেই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবি আদায় করবেই।
সে সময় খালেদা জিয়াকে সরকারবিরোধী আন্দোলন ও দাবি আদায় প্রশ্নে আত্মপ্রত্যয়ী মনে হয়েছিল। দৃঢ় মনোবল নিয়ে তিনি কথা বলেছিলেন। অনির্ধারিত এ সাক্ষাৎকারে বিরোধী দলের চলমান আন্দোলন, রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের ব্যর্থতা, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন বর্জন, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণ, ঢাকা সফরকালে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের বক্তব্যসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন বেগম জিয়া।
তখন ঢাকা সফরকালে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের অবাধ নির্বাচন ও সব দলের সঙ্গে সংলাপের যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন তা নিয়ে চারদলীয় জোটনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি পরিষ্কার বলেছিলেন, জাতিসংঘের মহাসচিব সব দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার আহ্বান জানিয়েছেন। এটা পালন কিংবা কার্যকর করার দায়িত্ব সরকারের। বিরোধী দলের নয়। সরকার কার সঙ্গে সংলাপ করবে সেটা তারাই ভাববে। আমরা আমাদের বক্তব্য পরিষ্কার বলে দিয়েছি। নতুন করে আমাদের অবস্থান খোলাসা করার কিছু নেই। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া কোনো প্রহসনের নির্বাচনে যাবে না। অতীতেও যায়নি।
‘সরকার দাবি না মানলে কোন পদক্ষেপ নেওয়া হবে?’ এমন প্রশ্নের জবাবে বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন, আমরা জনগণের কাছে যাচ্ছি। জনগণই আমাদের আস্থার জায়গা। আমাদের শক্তির ঠিকানা। আমাদের দাবির প্রতি জনগণ স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন দিচ্ছে। জনগণই দাবি আদায় করবে।
সেদিন গুলশানের দোতলার অফিস কক্ষে প্রবেশ করতেই ক্লান্তিহীন হাস্যোজ্জ্বল মুখে অফ হোয়াইট কালারের শাড়ি পরিহিত বেগম খালেদা জিয়া স্বাগত জানিয়েছিলেন। কুশল বিনিময়ের পর তিনিই জানতে চেয়েছিলেন, দেশের খবর কি? সাধারণ মানুষ কেমন আছে? খালেদা জিয়া বলেছিলেন, রোডমার্চ এতটাই সফল হচ্ছে যে, দেশের সব জেলা থেকে রোডমার্চ কর্মসূচি ঘোষণার দাবি আসছে। কিন্তু দেশের যে সব জেলায় রোডমার্চ করা সম্ভব হবে না সেগুলোতে জনসভা হবে। তখন ২৬ নভেম্বর (২০১১) খুলনা অভিমুখে রোডমার্চ কর্মসূচির বিষয়টি নিয়েও তখন জানিয়েছিলেন।
‘নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন শেষ মুহূর্তে বর্জনের পর কুমিল্লায় নির্বাচনে দল অংশগ্রহণ করবে কিনা?’ এমন প্রশ্নের উত্তরে বিএনপি নেত্রী বলেছিলেন- নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সরকার সেনা মোতায়েন করতে দেয়নি বলে আমরা বর্জন করতে বাধ্য হয়েছি। তারা শেষ মুহূর্তে সেনা মোতায়েনের দাবি শুধু লঙ্ঘনই করেনি, অন্যান্য দাবি-দাওয়াও উপেক্ষা করেছে।
ওই সাক্ষাৎকারে বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রসঙ্গেও কথা বলেছিলেন বেগম জিয়া। প্রশ্ন করা হয়েছিল- ‘দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কবে ভারমুক্ত হবেন?’ স্মিত হেসে সেদিন বেগম জিয়া বলেছিলেন, সময় মতোই সবকিছু করা হবে। তখন সবাই জানতে পারবেন। যদিও সময়টা কাছে না দূরে- তা নিয়ে সেদিন স্পষ্ট কিছু বলেননি বেগম জিয়া।
সাক্ষাৎকারে ‘সরকারের (তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার) আয়ু কত দিন হতে পারে?’ উত্তরে খালেদা জিয়া অনেকটা সতর্কতার সঙ্গে বলেছিলেন, আমি কি করে বলব! আল্লাহ আর জনগণ তা জানেন।
