প্রিবিএনপির বহিষ্কৃতরা দলে ফিরতে মরিয়া
শফিকুল ইসলাম সোহাগ
আওয়ামী শাসনামলে ৪৫৭ মামলা মাথায় নিয়েও রাজনীতির মাঠে সরব ছিলেন সাইফুল আলম নীরব। অনেকবার কারাবরণ করেছেন। একাধিকবার ছাত্রদলের সভাপতি, যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ঢাকা-১২ আসন থেকে স্বতন্ত্রভাবে ভোট করে দল থেকে বহিষ্কার হন। একইভাবে দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনে নির্বাচন করে বহিষ্কৃত হয়েছেন বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু।
শুধু নীরব ও টিপুই নন, গত জাতীয় নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বহিষ্কৃত হয়েছেন ১৯০ জন আলোচিত নেতা। নির্বাচনের সময় এসব বহিষ্কৃত নেতার পক্ষ নেওয়ায় আরও অনেক নেতা-কর্মী বহিষ্কার হন। তাদের মধ্যে আড়াই হাজারের বেশি নেতা-কর্মী এখন দলে ফিরতে চান। ইতোমধ্যে তারা দলে ফেরার জন্য আবেদনও করেছেন। আর বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে বিএনপিও।
জানা যায়, দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা ও নানা অনিয়মের অভিযোগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪ হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয় বিএনপি। এর মধ্যে আড়াই হাজারের বেশি নেতা-কর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে বিএনপি সূত্রে জানা যায়। যদিও নির্বাচনের ঠিক আগে বহিষ্কৃতদের একটি ক্ষুদ্র অংশকে দলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে দ্বিতীয় ধাপে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের দায়ে আরও দুই শতাধিক বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীকে বহিষ্কার করা হয়।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ১৯০ জন নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করলেও বিজয়ী হতে পেরেছেন মাত্র সাতজন। বিএনপি সূত্রে জানা যায়, স্বতন্ত্র হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ছাড়া বাকি ছয়জনই দলে ফেরার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে আবেদন জমা দিয়েছেন। তারা হলেন-কিশোরগঞ্জ-৫ থেকে বিজয়ী শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল, টাঙ্গাইল-৩ থেকে লুৎফর রহমান খান আজাদ, চাঁদপুর-৪ থেকে আবদুল হান্নান, কুমিল্লা-৭ থেকে আতিকুল আলম, দিনাজপুর-৫ থেকে এ জেড এম রেজোয়ানুল হক, ময়মনসিংহ-১ থেকে সালমান ওমর। বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত আলোচিত নেতারা এখন পুনরায় দলে ফিরতে উন্মুখ হয়ে আছেন। যতদিন দল তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে ফিরিয়ে না নেবে, ততদিন তারা সাধারণ কর্মী হিসেবেই দলের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চান। জানতে চাইলে সাইফুল আলম নীরব বলেন, ‘শহীদ জিয়ার আদর্শে আমি রাজনীতি করি। বিএনপির বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি বিএনপিতেই থাকতে চাই।’ তাইফুল ইসলাম টিপু বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে জীবনের শেষ বয়স পর্যন্ত থাকতে চাই। দল যখন প্রয়োজন মনে করবে, তখনই আমাকে ডাকবে।’ দলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা এ নেতাদের বেশির ভাগই আওয়ামী শাসনের ১৭ বছর ধরে স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিলেন। আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রভাগে থাকা এই নেতারা প্রতিনিয়ত মামলা ও গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হয়েছেন।
তাই অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে তাদের পুনরায় ‘ঘরে ফেরানোর’ পরামর্শ দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। তিনি বলেন, এক-দুই যুগ ধরে যাদের দলে অবদান ও ত্যাগ রয়েছে, তাদের ছোটখাটো যে ত্রুটিগুলো আছে, সেগুলো যদি নীতিনির্ধারকরা সংশোধনযোগ্য মনে করেন, তবে তাদের ফিরিয়ে আনা উচিত।
ভবিষ্যতের জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে তাদের পুনরায় দল করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
বিএনপির আরেকটি পক্ষ মনে করে, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কারণে ছয়টি আসনে বিএনপির হেভিওয়েট ও জোটের জ্যেষ্ঠ নেতারা পরাজিত হয়েছেন। ভোট ভাগাভাগির সমীকরণে অন্তত ১০টি আসনে অত্যন্ত কম ভোটের ব্যবধানে ধানের শীষের প্রার্থীরা হেরে যান। ফলে বহিষ্কৃতদের দলে ফেরানোর বিষয়ে বিএনপির হাইকমান্ড চরম সতর্কতা অবলম্বন করছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম বলেন, দলে অনেক অবদান থাকার পরও মাঝে মাঝে এমন কিছু পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন কঠোর সাংগঠনিক শাস্তি দিতে হয়। তবে আমি আবারও বলছি, তাদের যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তা আমরা আনন্দের সঙ্গে দিইনি, খুব কষ্ট নিয়েই দল এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন এ ব্যাপারে দল পরবর্তীতে কী সিদ্ধান্ত নেয় তা দেখার বিষয়। তবে এখন পর্যন্ত (পুনর্বহালের) কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
