প্লাস্টিক ঠেকাতে নতুন বিধান বাস্তবায়নে সংশয়

শামীম আহমেদ

প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। উৎপাদিত প্লাস্টিক পণ্যের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায় এবার উৎপাদনকারী, আমদানিকারক ও ব্র্যান্ড মালিকদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে ‘প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত উৎপাদনকারীর সম্প্রসারিত দায়িত্ব (ইপিআর) বিষয়ক নির্দেশিকা, ২০২৬’ জারি করা হয়েছে। ১৩ আগস্ট বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশের মাধ্যমে নির্দেশিকাটি কার্যকর করা হয়। এর ফলে প্লাস্টিক পণ্যের জীবনচক্র শেষ হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে হবে।

নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রথম দুই বছরে বাজারে ছাড়া প্লাস্টিকের অন্তত ১৫ শতাংশ বর্জ্য সংগ্রহ এবং সাড়ে ৭ শতাংশ পুনঃ চক্রায়ন করতে হবে বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে। পরবর্তী বছরগুলোতে বর্জ্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ এবং পুনঃ চক্রায়নের লক্ষ্যমাত্রা ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার অতিরিক্ত বর্জ্য সংগ্রহ করতে পারলে সরকার অনুমোদিত পদ্ধতিতে তা ‘প্লাস্টিক ক্রেডিট’ হিসেবে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির সুযোগ রাখা হয়েছে। সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা সাধারণ বর্জ্য হিসেবে যে প্লাস্টিক সংগ্রহ করবে, তা কোনো প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার অংশ হিসেবে গণনা করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকেই নিজস্ব বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে বর্জ্য সংগ্রহ করতে হবে। প্রতি বছর অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর নিয়মিত পরিদর্শন, নিরীক্ষা ও তথ্য যাচাই করবে। অসত্য তথ্য দিলে নিবন্ধন স্থগিত বা বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

তবে নতুন এই উদ্যোগের বাস্তবায়ন নিয়েই বড় প্রশ্ন উঠেছে। এর আগে পলিথিন নিষিদ্ধ, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ পরিবেশ সুরক্ষায় একাধিক আইন ও বিধিমালা করা হলেও বাস্তবে সেগুলো কাগজেই সীমাবদ্ধ। ফলে নতুন নির্দেশিকাটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হলে কাক্সিক্ষত ফল না পাওয়ার আশঙ্কাই বেশি বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।

নির্দেশিকাটি বাংলাদেশে উৎপাদিত বা ব্যবহৃত পুনঃ চক্রায়নযোগ্য ও অ-পুনঃ চক্রায়নযোগ্য সব প্লাস্টিক পণ্য এবং তালিকাভুক্ত পণ্যের প্রস্তুতকারক, আমদানিকারক ও ব্র্যান্ড মালিকদের জন্য প্রযোজ্য। তবে রপ্তানি আদেশের ভিত্তিতে পণ্য উৎপাদনকারী রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান এর আওতামুক্ত থাকবে। পরিবেশ অধিদপ্তর ধাপে ধাপে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে তালিকাভুক্ত করবে। প্রথম দুই বছরে বৃহৎ, পরবর্তী দুই বছরে মাঝারি এবং পঞ্চম বছরে ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে এর আওতায় আনা হবে। তালিকাভুক্তির ছয় মাসের মধ্যে নিবন্ধন নিতে হবে। নিবন্ধনের মেয়াদ হবে তিন বছর। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনঃ চক্রায়ন করলেই কেবল নিবন্ধন নবায়ন করা যাবে।

বাংলাদেশে প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতার প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন পরিবেশবিদরা। দেশে বছরে ১০ লাখ টনের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়। শুধু ঢাকাতেই উৎপন্ন হয় প্রায় আড়াই লাখ টন। পরিবেশ অধিদপ্তর ও ওয়েস্ট কনসার্নের গবেষণা অনুযায়ী, এর ৩৬ শতাংশ পুনর্ব্যবহার হয়, ৩৯ শতাংশ ল্যান্ডফিলে যায় এবং বাকি ২৫ শতাংশ নদীর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ে। পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী দিয়ে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক বঙ্গোপসাগরে পৌঁছানোর তথ্যও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

প্লাস্টিকের দূষণ শুধু নদী-সমুদ্রেই সীমাবদ্ধ নেই। মাটিতেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক্স অ্যান্ড প্ল্যান্ট ব্রিডিং বিভাগের অধ্যাপক ড. জামিলুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্লাস্টিক মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে। পলিথিনের কারণে মাটির অণুজীব বাড়তে পারছে না। ফলে নতুন মাটি তৈরি হচ্ছে না। গাছের শিকড় বিস্তারেও বাধা সৃষ্টি হচ্ছে এবং মাটির পানি ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব ভবিষ্যতে কৃষিতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

এর আগে ২০০২ সালের ১ মার্চ বিএনপি সরকারের আমলে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে আইন করে পলিথিন শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ করেছিল। শুরুর দিকে আইনের কঠোর প্রয়োগে পলিথিনের ব্যবহার কমলেও কয়েক বছরের মধ্যেই মাঠে কার্যকারিতা হারায় আইনটি। নিষিদ্ধের পর দুই যুগে প্লাস্টিকের ব্যবহার ও উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে পলিথিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর থেকে সুপারশপে এবং ১ নভেম্বর থেকে কাঁচাবাজারে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করা হলেও বাজারে তার প্রভাব পড়েনি। উল্টো অভিযান চালাতে গিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা হামলার শিকার হন।

পরিবেশবিদরা বলছেন, ইলেকট্রনিক বর্জ্য বিপজ্জনক হারে বাড়ায় সরকার ২০২১ সালে ‘ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা’ প্রণয়ন করে ইলেকট্রনিক পণ্যের উৎপাদক, আমদানিকারক ও ব্র্যান্ড মালিকদের পুরোনো পণ্য ফেরত নেওয়া ও পরিবেশসম্মতভাবে নিষ্পত্তির দায়িত্ব দিয়েছিল। কিন্তু পাঁচ বছর পরও এর বাস্তবায়ন শূন্য। বেসরকারি সংস্থা ভয়েসের সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া পরিবেশ অধিদপ্তরে নিবন্ধিত ১৫টি প্রতিষ্ঠানের কেউ গত অর্থবছরে একটিও মেয়াদোত্তীর্ণ ইলেকট্রনিক পণ্য সংগ্রহ করেনি। ৭৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের কোনো টেক-ব্যাক (পুরোনো পণ্য ফিরিয়ে নেওয়া) ব্যবস্থাই নেই। কোনো প্রতিষ্ঠানই বিপজ্জনক বর্জ্যরে সঠিক তথ্য রাখছে না। সংস্থাটির হিসাবে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন ই-বর্জ্য তৈরি হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্ব্যবহার হয় ১০ শতাংশেরও কম। ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরামের সভাপতি আমিনুর রসুল বলেন, বাংলাদেশে পলিথিন বহু আগেই নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে উৎপাদন ও ব্যবহার দুটোই বেড়েছে। শর্ষের ভিতরে ভূত না থাকলে নিষিদ্ধ পণ্যের এত বড় বাজার গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। ই-বর্জ্য নিয়ন্ত্রণেও বিধিমালা হয়েছে, কিন্তু কেউ মানছে না। নতুন নির্দেশিকাটির ক্ষেত্রেও মূল বিষয় হবে বাস্তবায়ন। বাস্তবায়ন না হলে পলিথিন নিষেধাজ্ঞা বা ই-বর্জ্য বিধিমালার মতো এই নির্দেশিকাটিও কাগুজে দলিল হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights