ফল কিনতেও এখন হিমশিম
নিজস্ব প্রতিবেদক
ফল এখন আর শুধু পুষ্টিকর খাবার নয়, অনেক পরিবারের কাছে রীতিমতো বিলাসপণ্য। বাজারে আমদানি করা প্রায় সব ধরনের ফলের দাম কেজিপ্রতি ৪০০ টাকা ছাড়িয়েছে। দেশি ফলের দামও কম নয়। ফলে সাধারণ মানুষের খাবারের তালিকা থেকে ধীরে ধীরে বাদ পড়ছে ফল। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন রোগীর স্বজনরা। চিকিৎসকের পরামর্শে ডেঙ্গু বা অন্যান্য রোগীর জন্য ফল কিনতে গিয়ে অনেক পরিবারকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের সঙ্গে আপস করতে হচ্ছে।
পান্থপথ হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত ভাইকে ভর্তি করেছেন আশরাফুল ইসলাম। ভাইয়ের জন্য একটি ডাব, একটি মালটা ও একটি ডালিম কিনতেই তাঁর খরচ হয়েছে ৫০০ টাকা। ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের মতো মানুষের জন্য এসব ফল কেনা খুবই কঠিন। কিন্তু কোনো উপায় নেই। ভাইয়ের চিকিৎসার সময় এসব ফল প্রয়োজন হওয়ায় বাধ্য হয়ে কিনতে হচ্ছে।’
বাজারে আমদানি করা গালা আপেলের কেজি ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকা, গোল্ডেন গ্রিন আপেল ৪৫০ টাকা, মালটা ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা, মোনাক্কা আঙুর ৪৩০ থেকে ৪৫০ টাকা, দক্ষিণ আফ্রিকার কমলা ৪৫০ টাকা এবং ডালিম ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আমদানি করা ফলের মধ্যে তুলনামূলক কম দামের নাশপাতিও কেজি প্রায় ৩০০ টাকা।
দেশি ফলেও স্বস্তি নেই। ড্রাগন ফলের কেজি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা, তরমুজ ৭০ থেকে ৮০ টাকা, পেঁপে ৭০ থেকে ১০০ টাকা এবং আম প্রায় ১৮০ টাকা। একেকটি ডাব কিনতে গুনতে হচ্ছে ১৬০ থেকে ২২০ টাকা। মাঝারি আকারের আনারসের দাম প্রায় ৮০ টাকা।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গেটে মেয়ের জন্য ডাব ও মালটা কিনতে এসে বিপাকে পড়েন আলমগীর হোসেন। ছোট একটি ডাবের দাম চাওয়া হয় ১৮০ টাকা। পকেটে থাকা মাত্র ৫০০ টাকা থেকে মেয়ের জন্য মালটাও কিনতে হবে তাঁকে।
তিনি বলেন, ‘আমার পকেটে মাত্র ৫০০ টাকা আছে।’ তাঁর হিসাবে, দুটি মালটা কিনতেই লাগবে ১৯০ টাকা। ডাব ও মালটা কেনার পর হাতে থাকবে সামান্য টাকা-যা দিয়ে মেয়ের অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো কঠিন।
অস্বাভাবিক দামের পেছনে আমদানি কমে যাওয়ার যুক্তিও খাটছে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে দেশে ফল আমদানি হয়েছে ২৩ হাজার ৭১৭ টন। আগস্টে আমদানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ১৮৬ টনে। সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৯ দিনেই আরও ২৩ হাজার ৫৩৬ টন ফল দেশে এসেছে।
অর্থাৎ বাজারে ফলের সরবরাহ বাড়ছে কিন্তু তার সুফল মিলছে না ভোক্তার ঘরে। আমদানি বাড়ার পরও খুচরা বাজারে ফলের দাম থাকছে আকাশছোঁয়া। প্রশ্ন উঠছে, আমদানি বাড়ার পরও কেন কমছে না দাম?
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমদানি করা ফলকে বিলাসপণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে আমদানিকারকদের প্রায় ১২২ শতাংশ কর ও শুল্ক দিতে হয়। এই উচ্চ কর-শুল্কের চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে ভোক্তার ওপর।
অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, ফলকে বিলাসপণ্য হিসেবে বিবেচনা না করে প্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে দেখা উচিত। তাঁর মতে, ফলের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে হলে এ বিষয়ে নীতিগতভাবে নতুন করে ভাবতে হবে।
বিশেষ করে ডেঙ্গু ও অন্যান্য রোগের সময় ফলের চাহিদা বাড়ে। অথচ তখনই অনেক পরিবারকে বাড়তি দামে ফল কিনতে হচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
ফল আমদানির পরিমাণ বাড়লেও যদি বাজারে তার প্রতিফলন না ঘটে, তাহলে শুধু আমদানি বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। কর-শুল্কের বোঝা, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব-সবকিছুই খতিয়ে দেখা জরুরি।
কারণ, পুষ্টিকর খাবার হিসেবে ফল যদি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তাহলে সেটি শুধু বাজারের সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। ফল যদি রোগীর পথ্য হয়, তবে তা কেন বিলাসপণ্যের দামে কিনতে হবে-এই প্রশ্নের উত্তর এখন জরুরি।
