ফুটবলে গৌরবের দিন বাংলাদেশের
স্বপ্নের জগতবাংলাদেশের নারী ফুটবলাররা উচ্ছ্বল তরুণীর মতোই স্বপ্নের জগতে বাস করছেন। তাদের সামনে আছে স্বপ্নের এক মিশন। যে মিশনে সফলতা-ব্যর্থতার চেয়েও বড় বিষয় হয়ে উঠেছে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানোর গৌরব। আজ এএফসি নারী এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন চীনের বিপক্ষে স্বপ্ন জয়ের মিশনে নামবেন আফঈদা খন্দকাররা। ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায় আছেন নারী ফুটবলাররা। ভাবা যায় বাংলাদেশের মেয়েরা এশিয়ান ফুটবলে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে খেলবে। কতই না তাদের ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করতে হয়েছিল। ২০০৩ সালে ধানমন্ডি উইমেন্স কমপ্লেক্সে মেয়েরা যখন ফুটবল খেলতে নামল তখন মৌলবাদীরা আন্দোলন শুরু করল। মাইকে প্রচার হলো শুধু ফুটবল নয়। সব খেলাধুলায় মেয়েদের হারাম। যদি বাংলাদেশে মেয়েদের ফুটবল খেলা শুরু হয় তাহলে দেশ অচল করে দেওয়া হবে। ভয়কে জয় করে মেয়েরা ঠিকই ফুটবল খেলে গেছেন। সাফল্য পেতে পেতে কোথায় নিয়ে গেছে দেশকে। দক্ষিণ এশিয়ায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। খেলছে স্বপ্নের এশিয়ান কাপ। ফল যাই হোক ফুটবলে নতুন গৌরবের অধ্যায় শুরু করলেন মেয়েরা। আজ শুরু ফুটবলের দিনটি বাংলাদেশের গৌরব হয়ে থাকবে।
ফুটবলে বাংলাদেশের মানুষ আবেগ ও বাস্তবতার মধ্যে আবেগকেই প্রাধান্য দিয়েছে সব সময়। কখনো কখনো সেই আবেগের শক্তি কাজেও দিয়েছে। ১৯৮০ সালে এএফসি এশিয়ান কাপে মাত্র ১০টি দল অংশ নেয়। এশিয়ার সেরা হওয়ার সেই লড়াইয়ে ছিলেন কাজী সালাউদ্দিন-আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নুরা। বাছাই পর্বের কঠিন বাধা পাড়ি দিয়েছিলেন কাতার ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে খেলে। চূড়ান্ত পর্বে উত্তর কোরিয়ার মতো শক্তিধর দলের বিপক্ষেও খেলেছিলেন সিনা টান করে। সে বছর উত্তর কোরিয়া ছিল এশিয়ান কাপের চতুর্থ দল। এর আগে ১৯৬৬ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলার অভিজ্ঞতাও ছিল উত্তর কোরিয়ার ঝুলিতে। এমন এক দলের কাছে বাংলাদেশ হেরেছিল ৩-২ ব্যবধানে। ম্যাচে গোল করেছিলেন কাজী সালাউদ্দিন ও চুন্নু। এরপর বাংলাদেশের জন্য এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্ব খেলা কেবল স্বপ্নই থেকে গেছে। বাছাই পর্বে কখনো কখনো প্রথম ধাপেই বাদ পড়েছে ছেলেরা। একবিংশ শতকের বেশির ভাগ সময় বাংলাদেশে ছেলেদের ফুটবল কেবল উল্টো পথেই হেঁটেছে। সম্প্রতি হামজা-জামালদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে অফুরন্ত সম্ভাবনা। তারপরও ছেলেরা এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্ব খেলবে, এমন স্বপ্ন দেখার সাহস খুব কমই আছে। তবে মেয়েরা সেই স্বপ্নটাই এক টানে বাস্তবে নামিয়ে এনেছেন। গত বছর মিয়ানমারের মাটিতে টানা তিন জয়ে নিশ্চিত করেছেন এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্ব। ইতিহাস গড়েছেন আগেই। এবার আরও একটি মাইলফলক স্থাপনের দিনে পৌঁছে গেলেন বাংলার বাঘিনীরা।
মেয়েদের ফুটবলে চীন এক পরাশক্তির নাম। এশিয়ান কাপেই ৯ বারের চ্যাম্পিয়ন চীনা মেয়েরা। গত আসরে ভারতের মাটিতেও তারা ছিল চ্যাম্পিয়ন। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৭ নম্বরে অবস্থান করছে চীন। বিপরীত দিকে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নারী ফুটবলে এক নবীন সদস্যই বলা চলে। র্যাঙ্কিংয়ে অবস্থান করছে ১১২ নম্বরে। ৯৫ ধাপ এগিয়ে থাকা চীনের বিপক্ষে বাংলাদেশ বড় কিছু করে ফেলবে, এমনটা কেই ভাবছে না। তবে কাজী সালাউদ্দিনরা যেভাবে সিনা টান করে এক অসম শক্তির বিরুদ্ধে খেলেছিলেন, তেমনটা আশা করাই যায়। পিটার বাটলার তার শিষ্যদের সেই সাহসী ফুটবলটাই খেলার জন্য প্রস্তুত করে তুলেছেন। আফঈদা খন্দকাররাও এর জন্য প্রস্তুত। পিটার বাটলার গতকাল ম্যাচপূর্ব অফিশিয়াল সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘আমাদের দিকে অনেক আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে সমর্থকরা। তবে আমাদের বাস্তবতার আলোকে লক্ষ্যটা ঠিক করতে হবে। আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই।’ অধিনায়ক আফঈদা খন্দকার বলেন, ‘আমরা প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপে খেলতে এসেছি। ভালো করার চেষ্টা থাকবে। প্রতিপক্ষ অনেক শক্তিশালী। তবে কোচের পরিকল্পনা মেনেই আমরা খেলতে চাই।’ চীনের কোচ আন্তে মিলিচিচ বলেছেন, ‘আমাদের জন্য একটা কঠিন ম্যাচ অপেক্ষা করছে। বাংলাদেশ তারুণ্য নির্ভর একটি দল। তারা টেকনিক্যালিও খুবই ভালো ফুটবল খেলছে। তবে আমরা নিজেদের খেলার ওপরই ফোকাস করতে চাই।’ চীনা অধিনায়ক উ হাইয়ান বলেছেন, ‘এটা আমাদের প্রথম ম্যাচ। কঠিন একটা ম্যাচ হতে যাচ্ছে এটা। তবে আমরা ইতিবাচক মানসিকতা নিয়েই খেলব।’
এএফসি নারী এশিয়ান কাপে আরও একটি দারুণ সুযোগ অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের সামনে। তিন ম্যাচের যেকোনো একটা জিততে পারলেই নারী বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেতে পারে বাংলাদেশ। এশিয়ান কাপের শীর্ষ ছয় দল খেলবে বিশ্বকাপে। কোয়ার্টার ফাইনালের চার জয়ী দল সরাসরি বিশ্বকাপ খেলবে। এ ছাড়া পরাজিত চার দল খেলবে প্লে-অফ। সেখানে বিজয়ী দুই দল বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশের সামনে বিশ্বকাপ খেলার হাতছানি!
