ফেনীতে একর পর এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চুরির ঘটনা, নিরাপত্তাহীনতায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী
ফেনী প্রতিনিধি
ফেনীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো একের পর এক চোরচক্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গভীর রাতে বিদ্যালয়ে হানা দিয়ে ল্যাপটপ, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, পানির মোটর, বৈদ্যুতিক মিটার, ফ্যান, বৈদ্যুতিক তারসহ বিভিন্ন সরকারি সম্পদ চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে দুর্বৃত্তরা।
কোথাও চুরির কারণে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, কোথাও শিক্ষার্থীরা মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে ফেনীর অন্তত ১৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চুরির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ফেনী সদরে আটটি, ছাগলনাইয়ায় চারটি এবং ফুলগাজী উপজেলায় তিনটি বিদ্যালয় রয়েছে। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় বিদ্যালয়গুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ১৯ জুন গভীর রাতে ফেনী পাইলট আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চোরের হানায় পানির মোটর, বৈদ্যুতিক মিটার, তারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম খুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এর ফলে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং দুই দিন প্রাক্-প্রাথমিক ও প্রথম শ্রেণির পাঠদান বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত একটি বিদ্যালয়ও যখন নিরাপদ নয়, তখন প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোর নিরাপত্তা নিয়ে আরও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চুরির শিকার হওয়া বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে- ফেনী পাইলট আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর চাড়িপুর হাজী আবদুল গণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মধ্য ফরহাদনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সোনাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গিল্লাবাড়ীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জেরকাছাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নেয়ামতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফেনী রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফুলগাজীর গোসাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মুন্সীরহাট আলী আজম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম বসন্তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ছাগলনাইয়ার আলহাজ মুন্সী চান মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব বাঁশপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শুভপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ঘোষালহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
শিক্ষকদের অভিযোগ, অধিকাংশ বিদ্যালয়ে নৈশপ্রহরী না থাকায় চোরদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। থানায় অভিযোগ করার পরও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর তদন্তের পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এতে অপরাধীরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে এবং একই ধরনের অপরাধ বারবার ঘটছে।
ফেনী রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে এক মাসে তিনবার চুরি হয়েছে। থানায় অভিযোগ করলে স্থানীয়ভাবে বসে বিষয়টি মীমাংসার পরামর্শ দেওয়া হয়। বলা হয়, চুরির সঙ্গে স্থানীয় কিশোর গ্যাং জড়িত। পুলিশের এমন মনোভাবে আমরা হতাশ।
ফেনী পাইলট আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফারাহ দিবা খানম বলেন, চুরির এক মাস পেরিয়ে গেলেও পুলিশ এখনো কোনো মালামাল উদ্ধার করতে পারেনি। বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা আতঙ্কে আছি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হৃষীকেশ শীল বলেন, পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
চোররা প্ল্যাগস্ট্যান্ড পর্যন্ত খুলে নিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যালয়গুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেন, চুরির ঘটনাগুলোর তদন্ত চলছে। জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে। পাশাপাশি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নিরাপত্তা জোরদার এবং নৈশপ্রহরী নিয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ধারাবাহিক চুরির ঘটনায় শিক্ষক-অভিভাবকদের দাবি, শুধু তদন্তের আশ্বাস নয়, বিদ্যালয়গুলোতে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নিয়মিত পুলিশি টহল, দ্রুত অপরাধীদের গ্রেফতার এবং চুরি হওয়া সরকারি সম্পদ উদ্ধারে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় শিক্ষার পরিবেশ আরও বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
