ফেসবুকে ভুয়া গল্প ছড়িয়ে ২১ লাখ টাকা আয়
অনলাইন ডেস্ক
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের আবেগ, রাগ ও ক্ষোভকে পুঁজি করে অর্থ উপার্জনের নতুন এক প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইচ্ছাকৃতভাবে বিতর্ক উসকে দেওয়া, উত্তেজক বক্তব্য কিংবা মিথ্যা ও মনগড়া তথ্য ছড়িয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়া আদায় করে নেওয়া এসব ব্যক্তিকে বলা হয় ‘রেজ বেইটার’। তাদের মূল লক্ষ্য হলো বেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা, পোস্টে মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া বাড়ানো এবং এর মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আয়ভাগ কর্মসূচি থেকে অর্থ উপার্জন করা।
যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপির ২৬ বছর বয়সী ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা কোভনটে ডেভন প্রিঙ্গল দাবি করেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি ও মনগড়া গল্প ফেসবুকে ছড়িয়ে তিনি মাসে ১৭ হাজার ডলারেরও বেশি আয় করেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২১ লাখ টাকা।
প্রিঙ্গলের দাবি, তিনি পাঁচটি আলাদা ফেসবুক হিসাব পরিচালনা করেন। এসব হিসাব থেকে প্রতি মাসে বিপুল অর্থ আয় করছেন তিনি। তবে তার সবচেয়ে আলোচিত কৌশল হলো এমন সব গল্প তৈরি করা, যেগুলো মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
সম্প্রতি এমনই একটি ভুয়া গল্প ছড়িয়ে ব্যাপক সাড়া পান প্রিঙ্গল। তিনি নিজেকে এক শিশুর মা হিসেবে পরিচয় দিয়ে একটি পোস্ট করেন। সেখানে দাবি করা হয়, পোশাক ‘অনুপযুক্ত’ হওয়ায় স্কুল থেকে তার সাত বছর বয়সী ছেলেকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষের এমন আচরণে ক্ষুব্ধ ওই মা এমনটাই তুলে ধরা হয় পোস্টে।
পোস্টটির সঙ্গে একটি ছোট ছেলের ছবিও দেওয়া হয়। ছবিতে তাকে স্কুলের পোশাক পরা অবস্থায় দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে ওই শিশু কিংবা তার মা কারও অস্তিত্ব নেই। পুরো ছবিটি ও ঘটনাটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি করা হয়েছিল।
প্রিঙ্গল জানান, মাত্র ১০ মিনিট সময় ব্যয় করেই তিনি ওই পোস্ট তৈরি করে নিজের একটি ফেসবুক হিসাবে প্রকাশ করেন। পোস্টটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এরই মধ্যে এটি ৮২ লাখের বেশি মানুষের নজরে এসেছে। আর ওই একটি পোস্ট থেকেই তিনি প্রায় ২ হাজার ৮০০ ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকার কাছাকাছি আয় করেছেন বলে দাবি করেন।
পোস্টে কাল্পনিক মায়ের বক্তব্য হিসেবে লেখা হয়, সন্তানকে নিজের মতো করে প্রকাশের সুযোগ দেওয়ার কারণে তাকে স্কুলে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু পোশাকের অজুহাতে তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ। এরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। শিশুদের স্কুলের পোশাক কেমন হওয়া উচিত, স্কুল কর্তৃপক্ষের আচরণ কেমন হওয়া উচিত এবং শিশুদের স্বাধীনভাবে নিজেকে প্রকাশের সুযোগ কতটা দেওয়া উচিত -এসব বিষয় নিয়ে হাজারো মানুষ মন্তব্য করতে থাকেন।
প্রিঙ্গল বলেন, বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব না থাকা একটি শিশু ও তার মাকে ঘিরে তৈরি গল্প এত বড় বিতর্কের জন্ম দেওয়ায় তিনি নিজেও বিস্মিত। তার মতে, এ ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কতটা উন্নত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করা কতটা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে প্রিঙ্গলের আয় করার কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, মানুষের আবেগকে উসকে দিয়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি করাটা তিনি উপভোগ করেন। যদিও তার দাবি, কাউকে ধোঁকা দেওয়া বা কারও ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে এসব কনটেন্ট তৈরি করেন না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিস্তার নিয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, এসব পোস্টে বিপুল মানুষের সম্পৃক্ততা তৈরি হলে নির্মাতারা আর্থিকভাবেও লাভবান হচ্ছেন। ফলে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর পেছনে অর্থনৈতিক প্রণোদনাও তৈরি হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের নীতিমালা পরিবর্তন করছে। সম্প্রতি এক্স তাদের আয় ভাগাভাগি কর্মসূচি বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। প্ল্যাটফর্মটির দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি নিম্নমানের ও অর্থহীন কনটেন্টের বিস্তার ঠেকাতেই এ সিদ্ধান্ত। এর পরিবর্তে মৌলিক ও নিজস্ব কনটেন্ট নির্মাতাদের উৎসাহ দিতে নতুন পুরস্কার কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সূত্র : এনডিটিভি
