ফ্রান্স বাংলাদেশকে আরো শক্তিশালী করে দিল –জয়ন্তঘোষাল

১৯৭১সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন সার্বভৌমরাষ্ট্র গঠন, আর তারছয় বছর পর ১৯৭৭সালের ২১ ডিসেম্বর জন্মেছেনফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ। তাঁর মাত্র ৪৫বছর বয়স। এহেন ইমানুয়েলম্যাখোঁ রাজধানী দিল্লিতে জি২০ শীর্ষ সম্মেলনেঅংশ নেওয়ার পর সটান চলেযান বাংলাদেশ। সেখানে অসাধারণ অভ্যর্থনা পান প্রধানমন্ত্রী শেখহাসিনার সঙ্গে।
সরষেবাটা দিয়ে ইলিশ মাছ, লোভনীয় মাংস প্রস্তুতি। খাদ্যরসিকইমানুয়েল খুব যত্ন করেবাংলাদেশের খাবারের স্বাদ-বর্ণ-গন্ধ অনুভবকরলেন।

গিগাইনস্টিটিউট ফর এশিয়ান স্টাডিজেরখ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব জাসমিন লর্জ ইমানুয়েল ম্যাখোঁরসফরের পর বলেছেন, বাংলাদেশেফরাসি প্রেসিডেন্টের সফর শুধু ঐতিহাসিকনয়, এক নতুন দিগন্তউন্মোচন করেছে বিশ্বরাজনীতিতে।

আসুন, আমরা ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের এই সফরের তত্ত্বতালাশকরি।

ফ্রান্সআমাদের সবার কাছেই একআকর্ষণীয় দেশ। প্রাচীন প্যারিসশহর, খ্রিস্টের জন্মের ২৫৯ বছর আগেযে শহরের অস্তিত্ব ছিল, যে শহরেপ্রথম রাষ্ট্রপতিকে দেশের প্রধান হিসেবে হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্টবলা হতো না। কিন্তুযিনি ফরাসি সাম্রাজ্যের অধিনায়ক ছিলেন, তাঁর নাম নেপোলিয়নবোনাপার্ট। সেই ১৮৪৮ থেকেআজ ২০২৩ সালে ৪৫বছরের যুবক ইমানুয়েল একদীর্ঘ যাত্রাপথ।

ইমানুয়েলম্যাখোঁ বলেছেন, যখন রাশিয়া ব্যস্তইউক্রেনকে আক্রমণ করা নিয়ে, যখনচীন ও আমেরিকার দ্বৈরথেবিশ্বরাজনীতি উথালপাথাল, তখন ফ্রান্স সেসববন্ধুর সঙ্গে মৈত্রীর বন্ধনে যুক্ত হতে চাইছে, যাদেরসঙ্গে ছিল তাদের প্রাচীনভালোবাসার সম্পর্ক। অবিভক্ত ভারতের সঙ্গে যে সম্পর্ক ছিল, ১৯৪৭ সালের পর, দেশভাগের পরনয়াদিল্লির সঙ্গে যে সম্পর্ক ছিল, ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশের সঙ্গেযে সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানেরসঙ্গে, আজ ইমানুয়েল ম্যাখোঁযেন সেই ইতিহাসের পটেসাম্প্রতিককে খুঁজে পেতে চাইছেন।

প্রতিরক্ষাক্ষেত্রে চুক্তি হচ্ছে। জলবায়ুর ক্ষেত্রে চুক্তি হচ্ছে। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে।

এসববিষয়গত উপাদানের পাশাপাশি সবচেয়ে যেটা বড় জিনিসযে বাংলাদেশও যে রকম এইপারস্পরিক ঝগড়াঝাঁটি, যুদ্ধ—এসবের মধ্যে বিকশিত হতে চাইছে, স্বাধীনএক সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা নিয়ে, ফ্রান্সও সেটা চাইছে। তাইফ্রান্স আর বাংলাদেশও কাছাকাছিআসছে। তবে ফ্রান্স ওবাংলাদেশের এই কাছাকাছি আসাকেভারত ইতিবাচকভাবেই দেখছে। তার কারণ ভারতওজি২০ সম্মেলনে এবার ফ্রান্সকে যথেষ্টগুরুত্ব দিয়েছে। একদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর অন্যদিকে আফ্রিকানইউনিয়ন—দুই পক্ষকে দুদিকেবসিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জি২০ সম্মেলনকরেছেন। বাংলাদেশের শেখ হাসিনাকে তাঁরবাড়িতে প্রধানমন্ত্রী আমন্ত্রণ জানিয়েছেন নৈশ ভোজে। শেখহাসিনার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেনের ভারত মণ্ডপে বৈঠকহয়েছে। সেলফি তোলা হয়েছে।

ফ্রান্সবাংলাদেশকে আরো শক্তিশালী করেদিলহাসিনার পাশে দেখা গেছেতাঁর কন্যাকে। এবার সফরে হাসিনারকন্যা আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ছিলেন। তাই প্রতিটি দ্বিপক্ষীয়বৈঠকেও তাঁর উপস্থিতি যথেষ্টনজরকাড়া। যদিও হাসিনার বোনওসফরসঙ্গী ছিলেন। শেখ হাসিনার কন্যারআনুষ্ঠানিক পদ ছিল প্রধানমন্ত্রীরউপদেষ্টা। তিনি সব বৈঠকেহাজির ছিলেন। নরেন্দ্র মোদিও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যে বাইডেনের বৈঠকহওয়া উচিত, সে ব্যাপারে চাপদিয়েছেন এবং বলেছেন, সেটাওকিন্তু কম পাওনা নয়।সব মিলিয়ে জি২০-এ দিল্লিতেযে সুরটা বাধা হয়েছে, সেইসুরই বাংলাদেশে এসে আছড়ে পড়েছেইমানুয়েল ম্যাখোঁর সফরে।

একদিকেবাইডেন চলে গেছেন ভিয়েতনামে, যে ভিয়েতনাম অধুনা চীনবিরোধী রাষ্ট্র বলে পরিচিত। তবেফ্রান্স কিন্তু অত্যন্ত মুনশিয়ানার সঙ্গে ইউক্রেনের সঙ্গেও সুসম্পর্ক রেখে ভারত ওবাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে চাইছে। বাংলাদেশের সঙ্গে এই সফর খুবফলপ্রসূ। কেননা অনেক সুনির্দিষ্ট আলাপ-আলোচনা ও চুক্তি হয়েছে।সেখানে কী আলোচনা হয়েছে, সে ব্যাপারেও একটু আমরা আলোকপাতকরছি।

কালেরকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশকে ঘিরে যে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, সেখানেবৈশ্বিক বড় শক্তি হলোমার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া।তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা এখন এমন পর্যায়েপৌঁছেছে যে তাদের একপক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ হলে অন্যপক্ষের ক্ষুব্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এঅবস্থায় বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ বিকল্পশক্তি হতে চায় ফ্রান্স।ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ তাঁর দুদিনের ঢাকাসফরের শেষ দিন এআগ্রহের কথা জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীশেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো স্মার্ট বাংলাদেশগড়া। সেই লক্ষ্য পূরণেবাংলাদেশের পাশে থাকার এবংবাংলাদেশকে সব রকম সহযোগিতাকরার আশ্বাস দেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টইমানুয়েল ম্যাখোঁ।

প্রধানমন্ত্রীরকার্যালয়ে বৈঠক ও চুক্তিস্বাক্ষর অনুষ্ঠান শেষ হলে যৌথসংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবংফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ বক্তব্য দেন। সেখানে ম্যাখোঁরফরাসি ভাষায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি ইন্দো-প্যাসিফিক, বিশেষ করে ভারত মহাসাগরকেঘিরে যে ভূ-রাজনৈতিকউত্তেজনা তৈরি হয়েছে, সেকথা তুলে ধরেন। তিনিবাংলাদেশে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধিতেও আগ্রহ প্রকাশ করেন।

ওই দিন দুই দেশেরযৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীশেখ হাসিনা ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টম্যাখোঁ দুই দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি এবং জনগণের জন্যঅংশীদারিকে ‘কৌশলগত’ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেকাজ করতে সম্মত হয়েছেন।যেকোনো দেশে অসাংবিধানিকভাবে সরকারপরিবর্তন এবং বেআইনি সামরিকঅভ্যুত্থানকে নিন্দনীয় বলে মত দেয়ফ্রান্স ও বাংলাদেশ। এইদুই দেশ সংঘাত, সহিংসতাও নৃশংস অপরাধের কারণে বাস্তুচ্যুতদের জন্য জরুরি এবংনিরবচ্ছিন্ন মানবিক সহায়তারও আহ্বান জানায়।

ফ্রান্সেরপ্রেসিডেন্ট তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘রাশিয়া যখন ইউরোপে অভিযানচালাচ্ছে, তখন পুরনো বন্ধুদেরসঙ্গে আমাদের অংশীদারি গড়া, সেটা অব্যাহতরাখা এবং টেকসই বিকল্পখুঁজে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটাসেই পথ, যেখানে আমরাবাংলাদেশকেও সঙ্গে নিতে চাই।’

ফ্রান্সেরপ্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ বলেন, ফ্রান্স ও বাংলাদেশ নিজেদেরস্বাধীনতার সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। বাইরের কোনোচাপকে তারা সমর্থন করেনা।

সেদিনেরআনুষ্ঠানিক বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনেরপ্রতি দুই দেশের অঙ্গীকারেরকথা তুলে ধরেন। তিনিবলেন, এগুলো ছাড়া উন্নয়ন টেকসইহতে পারে না।
প্রধানমন্ত্রীশেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘বাংলাদেশে দেড় দশক ধরেচলমান সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা, উন্নয়ন ও সুশাসন ফ্রান্সেরসঙ্গে আমাদের নতুন সম্পর্কের মূলভিত্তি।’ ফ্রান্স বাংলাদেশের জনগণের মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার সুরক্ষায়সরকারের দায়িত্বশীল ও প্রতিশ্রুতিমূলক কর্মকাণ্ডেসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে বলে জানান তিনি।

ফরাসিপ্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ ইন্দো-প্যাসিফিকে ফ্রান্সের অংশীদারদের সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগতভাবে স্বকীয়অবস্থানের ওপরও জোর দেন।তিনি আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জাতিসংঘ মিশনে মোতায়েন বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের কাজের প্রশংসা করেন। এ ছাড়া তিনি১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয়দেওয়ার মাধ্যমে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ভূমিকা রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখহাসিনাকে ধন্যবাদ জানান।

ফ্রান্সেরপ্রেসিডেন্ট জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা ও ম্যানগ্রোভ বনরক্ষায় সহযোগিতার আশ্বাস দেন। যৌথ বিবৃতিতেবলা হয়, বাংলাদেশ ওফ্রান্স বিশ্বাস করে, উন্নয়নশীল দেশগুলোরজন্য জলবায়ু অর্থপ্রাপ্তি সহজতর করার জন্য বৈশ্বিকপ্রচেষ্টা আরো ত্বরান্বিত করাউচিত।

আগামীমাসে প্যারিসে বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে স্কুলেশিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবার সহায়তার বিষয়ে একটি সম্মেলন হচ্ছে।সেই সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানান ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট।

কৌশলগতস্বায়ত্তশাসন, শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যঅংশীদারির কথা তুলে ধরেবাংলাদেশ ও ফ্রান্স আন্তর্জাতিকআইন এবং জাতিসংঘ সনদেরপ্রতি তাদের অটল প্রতিশ্রুতি, বিশেষকরে সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের নীতি ও বহুপাক্ষিকতাবাদেঅবিচল বিশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করেছে। গোটা পৃথিবী তাইএখন উথালপাথাল হচ্ছে।

আমারকলেজের এক মাস্টারমশাই বলতেন, বিশ্বায়ন হয়ে যাওয়ার পরসার্বভৌম রাষ্ট্রের মাথার ওপর যে চালছিল, সেই চাল উড়েগেছে। এখন আর কোনোরাষ্ট্রই আলাদা করে একা একাবাঁচতে পারে না। তাইপ্রত্যেককেই প্রত্যেকের ওপর নির্ভর করতেহয়। চীন ভেবেছিল, তারসম্প্রসারণবাদ দিয়ে গোটা পৃথিবীরএকটা বড় অংশকে একেবারেজব্দ করে দেবে। নিয়ন্ত্রণকরবে। শাসন করবে। সেটাওকিন্তু সম্ভব হয়নি।

আমেরিকারযে ভিসা পলিসি, তাতেআমেরিকা যেভাবে বাংলাদেশকে দুষেছে, আজকে সেই জায়গাথেকে আমেরিকা সরে এসেছে। উল্টোবাইডেনের সঙ্গে হাসিনার বৈঠক পুরো পরিস্থিতিটাইবদলে দিয়েছে। ভারতও আমেরিকাকে এ ব্যাপারে যথেষ্টসমালোচনা করেছে। সব মিলিয়ে ফ্রান্সকিন্তু একটা তৃতীয় অবস্থাননিয়ে বাংলাদেশকে আরো শক্তিশালী করেদিল। যেভাবে আমেরিকা মানবাধিকার, নির্বাচনকেন্দ্রিক ভিসা পলিসি নিয়েপড়ে আছে, ফ্রান্স কিন্তুসে ব্যাপারে কিছু বলল না।উল্টো ফ্রান্স বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াল। তারফলে আজ ফ্রান্সের ভূমিকায়গোটা দুনিয়ার কাছে ভারত-বাংলাদেশসম্পর্ক শুধু নয়, বাংলাদেশেরনিজস্ব অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা পেল।

আগামীদিনে বাংলাদেশে নির্বাচন আসন্ন। শেখ হাসিনা জি২০-এর এই সাফল্যএবং ফ্রান্সের সঙ্গে এই নতুন চুক্তিকেমূলধন করে আগামী দিনেএক নতুন পথের পথিকহবেন—এমনই প্রত্যাশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights