বক্সিং ডে : ইতিহাস, ঐতিহ্য আর ক্রীড়াঙ্গনের উত্তাপ
অনলাইন ডেস্ক
বক্সিং ডে- নাম শুনে অনেকের মনেই প্রথমে বক্সিং বা কুস্তির মতো কোনো লড়াইয়ের কথা আসতে পারে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। বক্সিং ডে মানে কোনো লড়াই নয়, বরং এটি বড়দিনের আনন্দকে আরও বিস্তৃত করার একটি ঐতিহাসিক ও সামাজিক রীতি, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রীড়াজগতেও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রথাগতভাবে বক্সিং ডে বলতে বোঝানো হয় খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব ক্রিসমাসের পরদিন, ২৬ ডিসেম্বর। ইতিহাস অনুযায়ী, এই দিনে ধনী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষরা তাদের গৃহপরিচারকদের বাক্সে ভরে উপহার দিতেন। সেই ‘বক্স’ থেকেই দিনটির নামকরণ হয় বক্সিং ডে। ধীরে ধীরে এই রীতি সামাজিক রূপ নেয় এবং উৎসবের অংশ হয়ে ওঠে।
বক্সিং ডের ধারণার সূচনা হয় ব্রিটিশ শাসনামলে, বিশেষ করে রাণী ভিক্টোরিয়ার সময় থেকে। পরে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে এর পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। সামর্থ্যবানরা শুধু নিজেদের পরিচারক নয়, আশপাশের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মাঝেও উপহার ও অর্থ বিতরণ শুরু করেন। পাশাপাশি চার্চের বাইরে রাখা দানবাক্সে অনুদান সংগ্রহ করে তা গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার রীতিও গড়ে ওঠে। এভাবেই ২৬ ডিসেম্বর পরিচিতি পায় ‘বক্সিং ডে’ নামে।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বক্সিং ডে ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে। ক্রিকেট, ফুটবল, হ্যান্ডবল ও ঘোড়দৌড়- এই চারটি খেলায় বক্সিং ডে উপলক্ষে বড় আয়োজন দেখা যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিকেট ও ফুটবলই এই দিনের সবচেয়ে আলোচিত আকর্ষণ।
ক্রিকেটে বক্সিং ডে মানেই মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড (এমসিজি)। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে ১৯৫০ সাল থেকে নিয়মিত বক্সিং ডে ম্যাচ আয়োজনের প্রচলন রয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বক্সিং ডে ম্যাচের যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৮ সাল থেকে। প্রতিবছর ২৬ ডিসেম্বর এমসিজিতে অস্ট্রেলিয়া ও সফরকারী দলের মধ্যে টেস্ট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়, যা বিশ্বজুড়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের বিশেষ আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে।
অস্ট্রেলিয়ার পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকাও বক্সিং ডেতে সেঞ্চুরিয়নে টেস্ট ম্যাচ আয়োজন করে থাকে। নিউজিল্যান্ডও সুযোগ পেলে এই দিনে আন্তর্জাতিক ম্যাচ রাখার চেষ্টা করে। অন্যদিকে প্রায় পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে অস্ট্রেলিয়ায় বক্সিং ডেতে টেস্ট বা ওয়ানডে ম্যাচ আয়োজনের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।
ফুটবল অঙ্গনেও বক্সিং ডের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে এই দিনে একাধিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। দর্শকদের আগ্রহের কথা মাথায় রেখে ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) সাধারণত বড় দলগুলোর ম্যাচ বক্সিং ডেতে রাখার চেষ্টা করে। ফলে ছুটির আমেজে স্টেডিয়াম ও টেলিভিশনের পর্দায় ফুটবল উৎসবে মেতে ওঠেন সমর্থকেরা।
সব মিলিয়ে বক্সিং ডে এখন আর শুধু একটি সামাজিক রীতি নয়, বরং বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও খেলাধুলার সম্মিলনে বক্সিং ডে আজ পরিণত হয়েছে উৎসবমুখর এক আন্তর্জাতিক উপলক্ষে।
