বগুড়ায় ক্লিনিক-হাসপাতালে নেই লেবার রুম, মানা হচ্ছে না নির্দেশনা

আবদুর রহমান টুলু, বগুড়া
বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত মুনাফার লোভে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার রোধ করা এবং মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে স্বাভাবিক প্রসব বা নরমাল ডেলিভারি উৎসাহিত করতে সরকারিভাবে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিলগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে ‘লেবার রুম’ (স্বাভাবিক প্রসব কক্ষ) স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হলেও মানছেন না বগুড়ার বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের মালিকরা। হাতে গোনা কয়েকটিতে থাকলেও বাকিগুলোতে চলছে সিজারিয়ান সেকশন (সি-সেকশন)। সরকারি নির্দেশনাকে তোয়াক্কা না করে অপ্রয়োজনীয় সি-সেকশন’র মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

এদিকে বেসরকারি ক্লিনিক ও হাতপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীদের অভিযোগ, গর্ভাবস্থার শুরুতে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অনেক ক্ষেত্রে দালালচক্র ও কিছু চিকিৎসাকেন্দ্র পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন জটিলতার ভয় দেখায়। অপারেশন না করলে মা কিংবা সন্তান বাঁচবে না এমন আশঙ্কা তৈরি করে সিজারিয়ানের সিদ্ধান্তে বাধ্য করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই মা ও সন্তানের জীবন নিয়ে ঝুঁকি নিতে না চাওয়ায় পরিবারগুলো তাদের পরামর্শ মেনে নেয়।

বগুড়া সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ৪৮৬। এর মধ্যে ২১৫টি ক্লিনিক ও হাসপাতাল এবং ২৭১টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাস্তবে জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৭০০ প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। অর্থাৎ দুই শতাধিক এর বেশি প্রতিষ্ঠান সরকারি নিবন্ধনের বাইরে অথবা লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই কার্যক্রম চালাচ্ছে। নিবন্ধনবিহীন ও অনুমোদনহীন যেসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার তালিকার বাইরে থেকে পরিচালিত হচ্ছে। সেগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

জানা যায়, দেশের সব বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারির জন্য পর্যাপ্ত সুবিধাসহ লেবার রুম বা ডেলিভারি রুম চালু রাখতে হবে এমন নির্দেশনা দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। নির্দেশনাটি বাস্তবায়নের জন্য একটি সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। এই সময়ের মধ্যে লেবার রুম স্থাপন ও চালু করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। কিন্তু সেই সময়সীমা পার হলেও বগুড়ার অধিকাংশ হাতপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে ‘লেবার রুম’ (স্বাভাবিক প্রসব কক্ষ) স্থাপন করা হয়নি। জেলায় কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন-ডক্টরস ক্লিনিক ইউনিট-১ ও ইউনিট-২, বনানী জেনারেল হসপিটাল, হেলথ সিটি, সুপার কেয়ার, দেশ হসপিটাল, সাইক জেনারেল হসপিটাল, ইনডিপেনডেন্ট হসপিটাল, ইউনাইটেড হসপিটালসহ অন্যান্য ক্লিনিক ও হাসপাতালে ‘লেবার রুম’ (স্বাভাবিক প্রসব কক্ষ) স্থাপন করা হয়েছে। আর অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে চলছে অপ্রয়োজনীয় সি-সেকশন। এতে করে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সেবা নিতে আসা অনেক পরিবার। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মিডওয়াইফদের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্বা দিয়েছে সরকার। যে কারণে দেশের প্রতিটি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে বাধ্যতামূলকভাবে ‘লেবার রুম’ (স্বাভাবিক প্রসব কক্ষ) স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় আলোচনায় আসে জেলার কয়েকটি বেসরকারি ক্লিনিক। ভুল রক্ত প্রয়োগ, অ্যানেসথেসিয়ার ভুল ডোজ, চিকিৎসায় অবহেলা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দেওয়ার অভিযোগে এসব মৃত্যুর ঘটনা জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কার্যকর নজরদারির অভাব, লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানের বিস্তার এবং মান নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার সুযোগে একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে নিয়মের বাইরে চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

বগুড়ার সিভিল সার্জন মো. খুরশীদ আলম জানান, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী শনিবার (১১ জুলাই) বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে ‘লেবার রুম’ (স্বাভাবিক প্রসব কক্ষ) স্থাপনের নির্দেশ ছিল। সোমবার (১৩ জুলাই) পর্যন্ত বগুড়ায় অবস্থিত যেসব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক ‘লেবার রুম’ স্থাপন করা হয়নি, সেসব প্রতিষ্ঠানে দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ‘লেবার রুম’ স্থাপন করার কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে ক্লিনিক মালিকদের সাথে কথা বলা হয়েছে। ক্লিনিক মালিকদের সংগঠনকে টেলিফোন ও চিঠির মাধ্যমে জানানো হয়েছে। এসব কিছুর পরেও যারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মানবেন না তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights