বঞ্চিত বগুড়ার আলোচিত উন্নয়ন

অধ্যাপিকা ড. হোসনে আরা বেগম

ব্রিটিশ ভারতবর্ষ আমলের পূর্বে সুলতান নাসিরুদ্দিন বলবনের পুত্র বগড়া খানের নামানুসারে বৃহত্তর বগুড়া জেলার নামকরণ হয়। বগুড়া জেলার অবস্থান, বগুড়ার বাসিন্দাগণের সরলতা, সাহসী পদক্ষেপ, কঠোর পরিশ্রম ইত্যাদি কারণে সেকাল থেকেই বগুড়া জেলার গুরুত্ব বাস্তবতার নিরিখে স্বীকৃত এবং অনুশীলিত।

ফলশ্রুতিতে হাজার বছরের পুণ্ড্র সভ্যতা বর্তমান মহাস্থানে সকল ধমর্রে তীর্থস্থান, মিলনমেলা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উৎকৃষ্ট উদাহরণ। বগুড়ার ভাসুবিহারে বিশ্বখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যা নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমসাময়িক ও সমকক্ষ ছিল। বগুড়ার ইতিহাস, ঐতিহ্য চর্চার সীমাবদ্ধতায় নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়তুল্য ভাসুবিহার বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিকতায় পরিচিতি পায় নাই।

তৎকালীন নিখিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীর সমাধি বগুড়ার নবাববাড়ীতে আজও আছে। বগুড়া ইতিহাস চর্চা পরিষদ এবং তার অঙ্গ গবেষণা সংস্থাসমূহ বর্তমানে ভবিষ্যতের জন্য প্রকৃত ইতিহাস এবং ঐতিহ্যগাথা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছেন। বগুড়ার সকল বাসিন্দার উচিত বগুড়ার ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং তার অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করা।

বিগত শাসনামলে উন্নত চাকরি, বৈশিষ্ট্যপূর্ণ চাকরি প্রাপ্তির লক্ষ্যে সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ থাকত ‘বগুড়ার বাসিন্দাদের আবেদন করার আবশ্যকতা নাই’। যে বগুড়া জেলা অতি ঘনবসতি, মাথাপিছু জমির পরিমাণ সর্বনিম্ন, বেকারত্ব, রোগ, ব্যাধি, জরা ইত্যাদি সমস্যায় জর্জরিত, এর মধ্যেও বগুড়ার উদ্যোক্তারা দুর্বার ও অদম্য গতিতে দৌড়ে চলছে, পুরাতন হৃত ইতিহাস জাগরণের চেষ্টা করছে।

বঞ্চনা ও বৈষম্যের জ্বালাতন-যন্ত্রণা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্বশরীরে মাঠে/ যুদ্ধক্ষেত্রে জিহাদকে জাহাদারী করার জন্য স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে, সেক্টর প্রধান হয়ে রণক্ষেত্রে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। এই অকুতোভয় যোদ্ধার জন্মস্থান বগুড়ায়। এই কারণেই বগুড়ার মানুষকে সবসময় সাইজ করার প্রবল প্রচেষ্টা চলছিল। কিন্তু বগুড়ার মানুষ বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী ও বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে বারবার ভোটে বিজয়ী করেছে। বগুড়ার সকল আসনে বিএনপির সাংসদ সহজে, স্বানন্দে বিজয়ী হয়েছে। ধানের শীষ তথা বিএনপির মনোনীত প্রার্থী বগুড়ার বাহিরের দূরবর্তী জেলা থেকে বগুড়ায় প্রার্থী হয়ে জিতেছেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, নোয়াখালীর ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রমুখ।

বগুড়া জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভূমিহীন, পথের ভিখারিদের দ্বারা সৃষ্ট টিএমএসএস-কে ৪৫ বছরের মধ্যে জাতীয়ভিত্তিক সংস্থায় পরিণত করতে মুখ্য ভূমিকা এবং সার্বিক সহযোগিতা ছিল বগুড়াবাসীর। ফলশ্রুতিতে টিএমএসএস বর্তমানে দেশখ্যাত মেডিকেল কলেজ, জেনারেল হাসপাতাল, ক্যান্সার হাসপাতাল, হার্ট সেন্টার ও বিশ্বখ্যাত বায়োমলিকুলার ল্যাব স্থাপন করে সাধারণ রোগ থেকে শুরু করে ব্যয়বহুল বিশেষায়িত ব্যাধির চিকিৎসা প্রদান করছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়সহ ৪৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ৫৪টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে মানুষকে দক্ষ করে তুলছে। পাশাপাশি তাদের হাতে মূলধন দেওয়ার জন্য অংশীদারত্বের ভিত্তিতে স্বনির্ভর চেতনায় ঋণ সহায়তা পরিচালনা করছে।

নিজের জন্য নয়, সরকারি বিধিবদ্ধ নিয়মে পরিচালিত সংস্থার ঋণ কার্যক্রমের সেবা চার্জকে ‘সুদখোরী’ বলা হয়। কিন্তু সেবাবিহীন বিভিন্ন ব্যাংক থেকে চড়া সুদে পাইকারিভাবে অর্থ ধার করে, খুচরাভাবে প্রত্যন্ত গ্রামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সদস্যদের আর্থিক সেবা বা লেনদেন প্রদানকে ‘সুদখোরী’ গণ্য করা মানবিক চেতনা নয়। বগুড়াবাসীর এরূপ বিকলাঙ্গ চিন্তা হতে পারে না এবং নেই। বগুড়াবাসীর এরূপ অবাস্তব ও বিদ্বেষপূর্ণ ধারণা থাকলে বগুড়ার টিএমএসএস সমগ্র বঙ্গদেশে বিস্তার লাভ করতে পারত না। সমগ্র উত্তরবঙ্গের মধ্যে বগুড়াতে পাঁচ তারকা হোটেলের তারতীব রক্ষা করে অমুসলিম বিদেশিদের সাথে অত্র অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও কার্যক্রমের সুযোগ সৃষ্টি করার জন্য পাঁচ তারকা ‘মম ইন পার্ক অ্যান্ড রিসোর্ট’-এর বার (ইধৎ)-এ দেশীয় কেউ তথা বগুড়ার কেউ প্রবেশ করবে না- ইহা ব্যবস্থাপনার প্রত্যাশা।

ব্যয়বহুল দুরারোগ্য ব্যাধি এবং এমবিবিএস, বিডিএস, স্নাতক প্রকৌশলী, স্নাতকোত্তর ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যাঁদের ব্যয় পরিশোধ করার যথেষ্ট সামর্থ্য আছে, তাঁরাও হতদরিদ্রের তুল্য ব্যয় পরিশোধে সংক্ষুব্ধ হলে তা বগুড়াবাসীর চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ট্রাস্টি সংস্থা সর্বসাধারণের সহায়তাপুষ্ট সংস্থা। যেসব সংস্থাকে ব্যক্তি বা পরিবার নিজ অঢেল সম্পত্তির মাধ্যমে সমাজসেবা হিসেবে পরিচালনা করে, তাদের সাথে টিএমএসএস-এর তুলনা বিবেচনাপ্রসূত নয় এবং তা বগুড়ার বৃহৎ মানসিকতার পরিচায়কও নয়।

ভূমিহীনদের ভূমিপ্রীতি থাকা স্বাভাবিক। তবুও টিএমএসএস-এর পক্ষ থেকে ভূমির দাবিদার সরকারি-বেসরকারি সকলকে সরেজমিনে প্রমাণসহ প্রতিকারের আহ্বান বরাবরই করা হয়েছে এবং তা চলমান আছে। বগুড়ার উন্নয়ন ব্যাহত করার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ ও অসহযোগ পরিত্যাগ করা এবং প্রতিকার করাই বগুড়াবাসীর মূল দাবি।

পাকিস্তানের জন্ম, বাংলাদেশের জন্ম এবং জুলাই অভ্যুত্থান-এই সবগুলোর মূল প্রেরণা ছিল বৈষম্য দূরীকরণ। বগুড়া দীর্ঘ বৎসর যাবৎ বৈষম্যের কবলে আছে। বগুড়ার কৃতি সন্তান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার যোগ্য উত্তরসূরী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রাহমান সাহেব যদি বঞ্চনায় কবলিত বগুড়াকে সাম্যতার শামিলে আনার ক্ষেত্রে আন্তরিক না হন, সেক্ষেত্রে প্রকৃতির পীড়া আসবে। তাই ভৌগোলিকভাবে উপযুক্ত, অর্থনৈতিকভাবে অতি পটেনশিয়াল, নিরাপত্তার দৃষ্টিতে নিরাপদ বগুড়াতে যে সমস্ত মন্ত্রী, এমপি উন্নয়নের আকুতি করছেন এটি তাদের ঈমানী দায়িত্ব।

সমালোচকদের সমস্যা, বিদ্বেষবাদীদের বিরোধ ছিল, আছে, থাকবে। সচেতন, শিক্ষিত, সৎ সুশীলগণকে উপযোগী (ফিজিবল) বগুড়ার উন্নয়নের মাধ্যমে সমস্ত বাংলাদেশের উন্নয়নকে আপহোল্ড করা হোক। নচেৎ প্রকৃতির পীড়া আসবে। তাই বঞ্চিত বগুড়ার আলোচিত উন্নয়ন বাস্তবায়নকে বাধা দিলে বিপদ আসন্ন হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights