বসুন্ধরা কিংসের ডাবল হ্যাটট্রিক মিশন
মনোয়ার হক
বাংলাদেশের ফুটবলে সবচেয়ে মর্যাদাকর আসর পেশাদার লিগের পর্দা উঠছে আজ; যা বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ নামে পরিচিত। ২০০৭-০৮ মৌসুমে পেশাদার ফুটবলের যাত্রা হলেও ঘরোয়া ফুটবল মাঠে গড়ায় ১৯৪৮ সালে। ঢাকা প্রথম বিভাগ লিগ নামকরণে আসর শুরু হয়। ৭৬ বছরের পুরনো এ লিগ দেশের ক্রীড়াঙ্গনে সবচেয়ে জনপ্রিয় আসরে রূপ নিয়েছে অনেক আগেই। ক্রিকেটে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে অবস্থান থাকুক না কেন, ফুটবল লিগের জনপ্রিয়তা কোনো খেলাই পেছনে ফেলতে পারেনি। গ্যালারিতে আগের মতো দর্শক না হলেও ঘরোয়া ফুটবলে মর্যাদাকর আসর ঘিরে আগ্রহ ঠিকই রয়েছে। ৭৬ বছর ইতিহাসে লিগের নামবদল হয়েছে তিনবার। প্রথমে ঢাকা প্রথম বিভাগ, ১৯৯৩ সালে ঢাকা প্রিমিয়ার ও সর্বশেষ ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ নামে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
আজ পেশাদার লিগে উদ্বোধনী দিনে তিনটি খেলা হবে। সন্ধ্যা সাড়ে ৫টায় কিংস অ্যারিনায় চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংস লড়বে চট্টগ্রাম আবাহনীর বিপক্ষে। রানার্সআপ ঐতিহ্যবাহী ঢাকা মোহামেডান গাজীপুর শহীদ বরকত স্টেডিয়ামে অ্যাওয়ে ম্যাচে লড়বে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে আসা ঢাকা ওয়ান্ডারার্সের বিপক্ষে। ম্যাচটি শুরু হবে বেলা ২টা ৩০ মিনিটে। মুন্সিগঞ্জ শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লে. মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে ব্রাদার্স ইউনিয়ন ও পুলিশ মুখোমুখি হবে। এটি ব্রাদার্সের হোম ভেন্যু। লিগ ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের মূল আলোচনা বা তর্ক হয় শিরোপা নিয়ে। নতুন মৌসুমে কারা চ্যাম্পিয়ন হবে এ নিয়ে তো একসময় সমর্থকদের মধ্যে হট্টগোল বেধে যেত। এসব কারণেই তো ফুটবল লিগের এত জনপ্রিয়তা। এর পেছনে আবার মূল ভূমিকা রেখেছে ক্লাবগুলোই। সত্যি বলতে কি, ক্লাবগুলোর কারণে দেশের ফুটবল বেঁচে আছে। শুরুর দিকে ওয়ান্ডারার্স, ভিক্টোরিয়া ও আজাদের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। পরে শিরোপা জেতায় মোহামেডানও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে মোহামেডান ও ওয়ান্ডারার্স ম্যাচের আবেদনই ছিল আলাদা। এর মধ্যে অফিস দল ইপিআইডিসিও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতার পর আবাহনীর আবির্ভাব ঘটলে দুই বছরের মাথায় তারাও জনপ্রিয়তা লাভ করে। স্বাধীনতার পর বিআইডিসি (বিলুপ্ত) প্রথম চ্যাম্পিয়ন হলেও জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে মোহামেডান-আবাহনীর ধারেকাছে ঘেঁষতে পারেনি। দুই প্রধান, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী, মর্যাদার লড়াই-কত যে খ্যাতি জুড়ে দেওয়া হয় দুই দল ঘিরে তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ব্রাদার্স ইউনিয়ন ১৯৭৫ সালে আসার পর তাদের খেলাও দর্শকের নজর কাড়ে। মুক্তিযোদ্ধাও চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। পেশাদার লিগে শেখ জামাল ধানমন্ডি ও শেখ রাসেলও শিরোপা খাতায় নাম লিখিয়েছে। তবে ইমেজ তৈরি করতে পারেনি সেভাবে।
প্রাচীনতম ঘরোয়া লিগে হিসাব পাল্টে গেছে বসুন্ধরা কিংসের অভিষেকের পর। ২০১৮-১৯ মৌসুমে শুরু করে একের পর এক লিগ ও টুর্নামেন্ট জিতে বসুন্ধরা কিংস দেশের ফুটবলের কিংস। ওয়ানডারার্স, আবাহনী ও মোহামেডানের হ্যাটট্রিক শিরোপা জয়ের কৃতিত্ব রয়েছে; কিন্তু বসুন্ধরা যে রেকর্ড গড়েছে তা অন্য ক্লাবের পক্ষে সম্ভব হয়নি। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত টানা পাঁচ লিগে চ্যাম্পিয়ন হয়ে যে ইতিহাস লিখেছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার কোনো ক্লাবেরই নেই। এবার আরেক ইতিহাস লেখার অপেক্ষায় কিংস। ১৯৭২ সালে অভিষেকের পর আবাহনীর শিরোপা সংখ্যা ১৭। এর মধ্যে পেশাদার লিগে সর্বোচ্চ ৬। কিংস এবার চ্যাম্পিয়ন হলে আবাহনীকে ছুঁয়ে ফেলবে। আসলে স্পর্শ করাটা তো নতুনত্ব নয়, তা হতেই পারে। কিন্তু কিংস চ্যাম্পিয়ন হলে আরেক ইতিহাস লিখবে। এবারের মিশনটা তাদের ডাবল হ্যাটট্রিকের। লিগে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন আছে, কিন্তু কারও তো টানা ছয়বারের রেকর্ড নেই। কিংসই ওড়াতে পারে সে গৌরবের পতাকা। ঘরোয়া ফুটবলে ১৩ ক্লাবের ৬৬ শিরোপা রয়েছে। কিন্তু ডাবল হ্যাটট্রিকের আনন্দ সত্যিই আনন্দের। দেখা যাক কী হয় শেষ পর্যন্ত।
