বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক ১২৫ বছরের
রেজাবুদ্দৌলা চৌধুরী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চার দিনের সরকারি সফরে আজ জাপান যাচ্ছেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় উপনীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সফরকালে তারেক রহমান আগামীকাল ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন। সফরকালে দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষিপ্রযুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিমান চলাচল এবং মেট্রোরেলের খরচ ও ঋণের সুদের হার নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার হবে এ সফরকালে। রোহিঙ্গা সংকট ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়েও কথা হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর জন্য এ সফর এক বিরল সৌভাগ্য ও আবেগের ঘটনা। এর আগে তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাপান সফর করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর সফরকালে ‘জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরাম’-এ বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা সম্পর্কে মূল বক্তব্য উপস্থাপন এবং শীর্ষ জাপানি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। তিনি চিবার এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, পারমাণবিক সদর দপ্তর এবং নাগোয়ার টয়োটা কারখানা পরিদর্শন করবেন।
জাপান বাংলাদেশের প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। মুক্তিযুদ্ধের পর যেসব দেশ বাংলাদেশকে প্রথম দিকে স্বীকৃতি দেয়, জাপান তার মধ্যে অন্যতম। বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি জাপানের স্বীকৃতি বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ বলে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশের প্রথম মেগা প্রকল্প যমুনা সেতু নির্মিত হয় জাপানি ঋণ সহায়তায়। যমুনা সেতুর নির্মাণ উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ সহজ করে। কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। সাংবাৎসরিক মঙ্গা বা দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা পায় উত্তরাঞ্চলের মানুষ। জাপানকে বলা হয় সূর্যোদয়ের দেশ। সে দেশের জাতীয় পতাকার সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার সাদৃশ্য লক্ষণীয়। জাপানের পতাকায় সাদা জমিনের মধ্যে রয়েছে গোলাকার লাল বৃত্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশের পতাকায় সবুজ জমিনের মধ্যে রয়েছে লাল বৃত্ত।
জাপানের সঙ্গে এ দেশের সম্পর্ক অন্তত ১২৫ বছরের পুরোনো। সেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে বাংলার সঙ্গে জাপানের মৈত্রীর সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখেন জাপানি দার্শনিক, সমাজ ও শিল্প সমালোচক তেনশিন ওকাকুরা। বিশ্বজুড়ে তিনি ওকাকুরা কাকুজো নামে পরিচিত। এ জাপানি দার্শনিক ‘এক এশিয়া’ নীতিতে বিশ্বাস করতেন। ১৯০১ সালে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশ সফর করেন। সে সময় ওকাকুরা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে আসেন ও তাঁর গুণমুগ্ধ হয়ে ওঠেন। তেনশিন ওকাকুরা ১৯১৩ সালে মারা যান। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তাঁর রবীন্দ্র সাহচর্য বজায় ছিল। ওকাকুরা স্বপ্ন দেখতেন চীন, জাপান ও ভারত তিন ঐতিহ্যবাহী সভ্যতার মধ্যে অতীত ইতিহাসের আলোকে ঘনিষ্ঠ মৈত্রীর সম্পর্ক গড়ে উঠবে। তবে আমরা জানি, ইতিহাসের ধারা পরবর্তী সময়ে ওকাকুরার স্বপ্নপূরণে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এশিয়ার প্রাচীন তিন সভ্যতার মধ্যে যে মেলবন্ধন, যুগ যুগ ধরে তা তিনটি দেশের অগ্রসর অনেক ব্যক্তিত্বকে প্রভাবিত করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ছিল পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর পক্ষে। অন্যদিকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার সুবাদে জাপান পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ করতে বাধ্য হতো। জাপানে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ঘাঁটি স্থাপন করে। জাপানি সামরিক বাহিনীর আত্মরক্ষা ছাড়া আক্রমণাত্মক ক্ষমতা অর্জনের সুযোগ ছিল না। ফলে কোনো ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচরণ করা তাদের পক্ষে অসম্ভব বলে বিবেচিত হতো। তারপরও জাপানিরা মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশের প্রতি নীরবে হলেও সহানুভূতি দেখিয়েছেন। ১৯৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোতে জাপান সরকার প্রকাশ্যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে এগিয়ে আসতে না পারলেও দেশটির রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের প্রায় সবাই ছিলেন বাংলাদেশের পক্ষে। উন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে প্রথম দিকে যারা স্বীকৃতি দিয়েছে তাদের মধ্যে জাপান অন্যতম। এশিয়ার সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশ জাপান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েই বসে থাকেনি। বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবেও ভূমিকা রেখেছে। স্বাধীনতার ঠিক পরপরই যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের রাস্তাঘাট, সেতু এবং অর্থনৈতিক অবকাঠামো গড়তে জাপান উদারভাবে সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসে। জাপান দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী। দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো যেমন যমুনা সেতু, যমুনা সার কারখানা, কর্ণফুলী সার কারখানা, মেট্রোরেলসহ বড় বড় প্রকল্পে জাপান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (জাইকা) সহজ শর্তে ঋণ দিয়েছে।
জাপান বাংলাদেশকে প্রথম থেকেই উদারভাবে সহায়তা করে আসছে। বাঙালির জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য মমত্ববোধের পেছনে রয়েছে এক বাঙালি বিচারপতির ক্যারিশমা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানিদের যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য গঠিত হয় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের ‘টোকিও ট্রায়াল’। ১১টি দেশের ১১ জন প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত সেই টোকিও ট্রায়ালে একজন বাঙালি বিচারপতিও ছিলেন।
কুষ্টিয়ার সন্তান ওই বাঙালি বিচারপতির নাম রাধাবিনোদ পাল। তাঁর প্রজ্ঞা আর দৃঢ় মনোভাবের কারণে জাপানিরা অনেক বড় ক্ষতির হাত থেকে রেহাই পান। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জাপানিদের বাড়াবাড়ির পেছনে অল্প কয়েকজন মানুষের হাত ছিল। কিন্তু মিত্রশক্তি চেয়েছিল পুরো জাতির ওপর দায় চাপাতে। সে দেশের সম্রাটকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করতেও চেয়েছিল তারা। কারণ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে জাপানিরা তাদের সম্রাটকে সূর্যের দেবী আমাতেরাসুর বংশধর এবং জীবন্ত ঈশ্বর হিসেবে ভাবতেন। ফলে সম্রাট জাপানিদের আত্মোৎসর্গের নির্দেশ দিলে তারা তা নির্দ্বিধায় পালন করত। এটি ছিল জাপানের সামরিক শক্তি অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ। যে কারণে মিত্রশক্তি জাপানের সামরিক বাহিনীকে শক্তিহীন করার পাশাপাশি তাদের সম্রাটের মর্যাদাহানির পরিকল্পনা এঁটেছিল। যেটি বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের দঢ়তায় সম্ভব হয়নি। যে কারণে জাপানের সম্রাট হিরোহিতো বাঙালিদের প্রতি বিশেষ মমত্ববোধ করতেন। কুষ্টিয়ায় জন্ম নেওয়া বাঙালি বিচারক রাধাবিনোদ পালের নাম এখনো জাপানি পাঠ্যপুস্তকে পাঠ্য। তাঁর নামে জাপানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেশ কিছু স্মৃতিস্তম্ভ। বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও ছিলেন। হেগের আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক হিসেবেও তিনি বাংলা ভাষীদের মুখ উজ্জ্বল করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধির দ্বার খুলে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। অবকাঠামোর উন্নয়নে জাপানের সহায়তা আরও বাড়বে এমন প্রত্যাশা বাংলাদেশের। জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক বহুমুখীকরণে লাভবান হবে উভয় দেশ। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তোরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য জাপানি সহযোগিতা আশীর্বাদ বলে বিবেচিত হবে।
