বাঘার হ্যাটট্রিক
মুহাম্মদ সেলিম ও ইমরান এমি, চট্টগ্রাম
ঐতিহাসিক লালদীঘির ময়দানের উত্তপ্ত বালুর মঞ্চে তখন পিনপতন নীরবতা। হাজারো দর্শকের চোখ কেবল ২০ ফুট বাই ২০ ফুটের ওই রিংয়ের দিকে। একদিকে বুকের ভিতর প্রতিশোধের আগুন নিয়ে মত্ত মোহাম্মদ রাশেদ, অন্যদিকে টানা দুবারের চ্যাম্পিয়ন কুমিল্লার বাঘা শরীফ। পেশির বুননে আর শক্তির মহড়ায় মুহূর্তেই বদলে যাচ্ছিল দৃশ্যপট। কিন্তু শেষ হাসিটা হাসলেন সেই ‘বাঘা’ই। রাশেদের প্রতিশোধের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে, টানা তিন আসর জিতে ঐতিহাসিক আবদুল জব্বারের বলীখেলার ১১৭তম আসরে স্বপ্নের হ্যাটট্রিক শিরোপা নিজের করে নিলেন বাঘা শরীফ।
জব্বারের বলীখেলার এবারের লড়াই ছাড়িয়ে গেছে নিকট অতীতের সব রোমাঞ্চকে। টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অদম্য বাসনা নিয়ে বালুর মঞ্চে পা রেখেছিলেন বাঘা শরীফ। তাঁর বজ্রমুষ্টি আর অসাধারণ কৌশলের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতেই হয়েছে সব বলীকে। এ জয়ের মধ্য দিয়ে বলীখেলার এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাসে নিজের নামের পাশে হ্যাটট্রিকের অনন্য কীর্তি গড়লেন তিনি। এর আগে রয়েছেন শুধু কক্সবাজারের রামুর কিংবদন্তি বলি দিদারুল ইসলাম প্রকাশ দিদার বলি। তিনি ১৩ বার চ্যাম্পিয়ন হয়ে এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েন। শনিবারের ঐতিহাসিক বলীখেলার ফাইনালটি ছিল মূলত একটি ‘অল কুমিল্লা’ শোডাউন। চ্যাম্পিয়ন বাঘা শরীফ এবং রানারআপ রাশেদ দুজনেরই বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। চট্টগ্রামের বুকে কুমিল্লার দুই বীরের এমন দাপট যেন প্রমাণ করেছে, বলীখেলায় এখন একচেটিয়া রাজত্ব চলছে কুমিল্লার। পুরো লালদীঘি ময়দান যখন দুই কুমিল্লার বলির লড়াই দেখছিল, তখন দর্শকদের মধ্যেও ছিল অন্যরকম এক উত্তেজনা। গত দুই আসরে ফাইনালে উঠেও এই বাঘা শরীফের কাছে হেরেই রানারআপ হতে হয়েছিল রাশেদকে। তাই এবারের ফাইনালটি রাশেদের জন্য ছিল প্রতিশোধের মঞ্চ। শুরু থেকেই রাশেদ ছিলেন ভীষণ আক্রমণাত্মক। প্রায় ২০ মিনিটের এক হাড্ডাহাড্ডি ও শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই দেখেছে লালদীঘি ময়দান। কেউ কাউকে একচুলও ছাড় দিতে নারাজ! একবার রাশেদ শরীফকে চেপে ধরেন তো, পরমুহূর্তেই শরীফের উল্টো প্যাঁচে কুপোকাত হওয়ার দশা। কিন্তু ২০ মিনিটের সেই মহাকাব্যিক লড়াইয়ের শেষ ভাগে এসে অভিজ্ঞতার কাছে হার মানেন রাশেদ।
ফুরিয়ে যায় তাঁর শক্তি, আর সেই সুযোগে চূড়ান্ত প্যাঁচে রাশেদকে মাটিতে কুপোকাত করে টানা তৃতীয়বারের মতো শিরোপা ছিনিয়ে নেন বাঘা শরীফ। ফলে দুই গত আসরের হারের প্রতিশোধ নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ এবারও ফসকে গেল রাশেদের হাত থেকে।
এ হারের ফলে টানা তিনবার ফাইনালে উঠেও স্বপ্নের ট্রফি ছুঁতে ব্যর্থ হন রাশেদ। এর আগে প্রথম সেমিফাইনালে মিঠু বলিকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠেন রাশেদ। দ্বিতীয় সেমিফাইনালে দুইবারের চ্যাম্পিয়ন শাহ জালাল বলিকে হারিয়ে হ্যাটট্টিক ফাইনালে ওঠেন বাঘা শরীফ। ১৯০৯ সালে চট্টগ্রামের বদরপাতি এলাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুবসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করতে এ প্রতিযোগিতার সূচনা করেন। এ প্রতিযোগিতা জব্বারের বলীখেলা নামে পরিচিতি লাভ করে। প্রতি বছর ১২ বৈশাখ নগরের লালদীঘি মাঠে বলীখেলা অনুষ্ঠিত হয়। এ খেলায় অংশগ্রহণকারীদের বলা হয় ‘বলি’।
