বাঙ্কার বাস্টার বোমা বহনকারী বি-২ স্পিরিট কতোটা বিধ্বংসী?

অনলাইন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় মার্কিন বিমান বাহিনীর আধিপত্য ও কৌশলগত দাপট দেখার চেষ্টা করছে। পেন্টাগনের সাবেক বিশেষজ্ঞ ও সামরিক বিশ্লেষক ক্রিস এসবোর্নের দেওয়া তথ্যমতে, মার্কিন বি-২ স্পিরিট স্টিলথ বোমারু বিমান বর্তমানে ইরানের অত্যন্ত সুরক্ষিত ও ভূগর্ভস্থ লক্ষ্যবস্তুগুলোতে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করছে। ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এ অভাবনীয় সাফল্যের পর এই অত্যাধুনিক বিমানগুলো এখন ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো ও অস্ত্রভাণ্ডার ধ্বংসের মূল হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

এই অভিযানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো বি-২ বিমানে ব্যবহৃত ‘ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনেট্রেটর’ বা এমওপি। ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের এই বিশালাকার বোমাগুলো পাহাড় বা কংক্রিটের কয়েকশ ফুট গভীরে গিয়ে বিস্ফোরিত হতে সক্ষম। বিশেষ করে ইরানের ভূগর্ভস্থ ড্রোন কারখানা ও গোলাবারুদের ডিপো লক্ষ্য করে এই ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমাগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে, যা মাটির নিচের লক্ষ্যবস্তুকে মুহূর্তেই ধূলিসাৎ করে দেয়।

বি-২ স্পিরিট-এর বিশেষ ‘ব্যাট-উইং’ বা বাদুড়ের ডানার মতো গঠন একে সাধারণ রাডারের কাছে প্রায় অদৃশ্য করে রাখে। এতে কোনো উলম্ব পাখনা না থাকায় রাডার সিগন্যাল বিমানের গা থেকে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে যেতে পারে না। ফলে রাশিয়ার তৈরি শক্তিশালী এয়ার ডিফেন্স নেটওয়ার্ক ভেদ করেও এটি অনায়াসেই ইরানি আকাশসীমায় প্রবেশ করতে সক্ষম হচ্ছে।

শত্রুর ইনফ্রারেড বা তাপ-সংবেদনশীল সেন্সরকে ফাঁকি দিতে বি-২ বিমানের ইঞ্জিনগুলো মূল কাঠামোর ভেতরে এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যেন বাইরে থেকে কোনো তাপ অনুভূত না হয়। বিমানের নির্গত গরম বাতাসকে পারিপার্শ্বিক বাতাসের তাপমাত্রার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে ছাড়া হয়, যা একে থার্মাল ডিটেকশন থেকে সুরক্ষা দেয়।

১৯৮০-এর দশকের নকশা হলেও বর্তমানের বি-২ বোমারু বিমানগুলো অত্যাধুনিক ডিজিটাল মস্তিস্ক দ্বারা পরিচালিত। এর পুরনো কপার ক্যাবল সরিয়ে দ্রুতগতির ফাইবার-অপটিক নেটওয়ার্ক এবং শক্তিশালী ইন্টিগ্রেটেড প্রসেসিং ইউনিট বসানো হয়েছে। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে আসা বিপুল পরিমাণ তথ্য বা ডেটা পাইলটরা মুহূর্তের মধ্যে বিশ্লেষণ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন।

বি-২ স্পিরিট-এর মূল দায়িত্ব কেবল বোমা বর্ষণ নয়, বরং শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে একটি ‘সেফ করিডোর’ তৈরি করা। এটি প্রথমে গোপনে ঢুকে রাডার ও মিসাইল সাইটগুলো ধ্বংস করে দেয়, যাতে পরবর্তীতে বি-৫২ স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেস বা বি-১বি ল্যান্সারের মতো কম শক্তিশালী বা কম স্টিলথ সম্পন্ন বিমানগুলো নিরাপদে আক্রমণ চালাতে পারে।

বি-২ বোমারু বিমানটি জ্বালানি না নিয়ে টানা ৬,০০০ নটিক্যাল মাইল পথ পাড়ি দিতে পারে। এটি কেবল বিশাল এমওপি বোমাই নয়, বরং ২,০০০ ও ৫,০০০ পাউন্ডের জেডিএএম এবং বি-৬১ মড ১২-এর মতো পারমাণবিক বোমা বহনেও সক্ষম। এই বহুমুখী সক্ষমতা একে বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর যুদ্ধবিমানে পরিণত করেছে।

সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বি-২ স্পিরিট-এর এই সফল অপারেশনগুলো মূলত যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রজন্মের স্টিলথ বোমারু বিমান বি-২১ রেইডারের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে। বি-২১ দেখতে অনেকটা বি-২ এর মতো হলেও এটি আরও বেশি ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন হবে, যা আগামী দশকের আকাশ যুদ্ধের সংজ্ঞা বদলে দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights