‘বাণিজ্যিক জাহাজে প্রাণঘাতী হামলা যুদ্ধাপরাধ’

অনলাইন ডেস্ক

একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে আচ্ছন্ন রাজেশ শর্মা। গত বুধবার ওমান উপকূলে পালাউ পতাকাবাহী জাহাজ এমটি সেত্তেবেলোয় মার্কিন হামলায় নিহত তিন নাবিকের একজন ছিলেন তার ছেলে আদিত্য শর্মা। মাত্র ২৩ বছর বয়সী আদিত্য প্রশিক্ষণার্থী ডেক ক্যাডেট ছিলেন।

আদিত্যের অকাল মৃত্যুর জন্য সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন রাজেশ শর্মা। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের সুস্পষ্ট অভিযোগ এনেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়ার জন্য ভারত সরকারের প্রতি দাবি জানান।

মাত্র চারদিনের ব্যবধানে ভারতীয় নাবিকদের পরিচালিত তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন হামলার ঘটনায় ওমান উপকূলে আতঙ্ক ছড়িয়েছে, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কেও উত্তাপ এনেছে। গত সোমবার ওমান উপকূলে পালাউয়ের পতাকাবাহী এমটি মারিভেক্সে মার্কিন হামলার পর রাজেশ শর্মা তার ছেলে আদিত্যকে ফোন করেন।

আদিত্য জানায়, আক্রান্ত জাহাজ থেকে তারা কিছুটা দূরে আছে এবং নিরাপদে আছে। সেটা ছিল সন্তানের সাথে তার শেষ কথা। বুধবার আদিত্য তার বাবাকে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠায়, আমরা ভালো আছি। তার এক ঘণ্টার মধ্যে আদিত্যের জাহাজ সেত্তেবেলো হামলার শিকার হয়। ২৪ ভারতীয় নাবিকের মধ্যে ২১ জনকে উদ্ধার করা হয়। হারিয়ে যাওয়া তিন নাবিকের মধ্যে একজন ছিলেন আদিত্য। পরে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

বুধবার সেত্তেবেলোয় হামলার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়াদিল্লীতে মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জেসন মিক্সকে তলব করে এ হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়। এই হামলাগুলোকে “গভীর উদ্বেগজনক” আখ্যা দিয়ে বৃহস্পতিবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবিলম্বে এ ধরনের হামলা বন্ধের আহ্বান জানায়।

বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে বলেন, “আমরা আমাদের নাবিক সম্প্রদায়ের কল্যাণ ও সুরক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিই। যখন ‘এমটি সেত্তেবেলো’ জাহাজে এই সুনির্দিষ্ট হামলাটি ঘটেছিল, তখনই আমরা মার্কিন পক্ষের কাছে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছি।”

কিন্তু সে নিন্দা ও প্রতিবাদে কাজ হয়নি। জয়সওয়াল যখন ব্রিফ করছেন, তখন ওমান উপকূলে হামলা হয় গিনি বিসাউয়ের পতাকাহী এমটি জলবীরে। এ জাহাজটিও মূলত ভারতীয় নাবিকরা পরিচালনা করেন। সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার- মাত্র চারদিনের মধ্যে তিনটি জাহাজে হামলা এবং তিন নাবিকের প্রাণহানীর ঘটনায় ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। তাদের পরিবারে ছড়িয়েছে আতঙ্ক।

নিহত নাবিক আদিত্য শর্মার বাবা রাজেশ শমা নিছক সন্তান হারানোর শোকে আবেগাপ্লুত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনেননি।

নিজের অভিযোগের পক্ষে যুক্তিও তুলে ধরেন তিনি, ‘ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে কোনো বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ করা অবশ্যই একটি যুদ্ধাপরাধ।’

ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘কার্গো জাহাজগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার অনেক উপায় আছে—আপনারা সেখানে সামরিক বাহিনী পাঠাতে পারতেন, নাবিকদের গ্রেপ্তার করতে পারতেন। কিন্তু প্রাণঘাতী মারাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে তাদের ওপর আক্রমণ করার কোনো অধিকার আপনাদের নেই।”

মাকিন ‍যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার খবর অস্বীকার করেনি। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড-সেন্টকম এর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, বারবার মার্কিন নির্দেশনা উপেক্ষা করা এবং ইরান থেকে তেল পরিবহনের কারণেই হামলা চালানো হয়েছে।

তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ সুনির্দিষ্টভাবে অস্বীকার তরেছে এমটি সেত্তেবেলোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। তারা ভারতের তিন নাবিকের মৃত্যুর জন্য মার্কিন বাহিনীকেই দায়ী করেছেন। সেত্তেবেলোর ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই প্রাণহানির ঘটনায় জবাবদিহিতা এবং একটি স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন।

জাহাজটি মার্কিন বাহিনীর নির্দেশ উপেক্ষা করেছে এবং ইরানের তেল পরিবহন করছিল— এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতিতে বলা হয়, ঘটনার আগে জাহাজের সাথে কোনো কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন করা হয়নি। যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল—এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ থাকলে তা জনসমক্ষে প্রকাশের জন্য তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। ইরানের সাথে যোগাযোগ বা ইরানি তেল পরিবহনের অভিয়োগও সুস্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছে সেত্তেবেলোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।

কে সত্য বলছেন, তা নিয়ে হয়তো অনেক চাপানউতোর হবে। বিনা অপরাধে তিন বেসামরিক নাবিকের মৃত্যুর আসল সত্যটা হয়তো কখনোই জানা যাবে না। সত্য যাই হোক, একমাত্র সন্তান হারানোর শোক হয়তো কখনোই ভুলতে পারবেন না রাজেশ শর্মা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights