বানের জলে লাখো ঘরে নেমে এলো হাহাকার
আজহার মাহমুদ, চট্টগ্রাম:
চটগ্রামে টানা বৃষ্টি ও বন্যায় লাখো পরিবারে হাহাকার নেমে এসেছে। কৃষিজীবী, মৎসজীবী, খামারি, পশুপালনে নির্ভরশীলদের জীবনে নেমে এসেছে দুঃখের স্রোত। প্রায় এক সপ্তাহ বানের জলে আটকে থেকে, নির্ঘুম রাত, অভুক্ত-তৃষ্ণার্ত সময় পেরিয়ে তারা এখন নতুন দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। কারো পুকুরের মাছ ভেসে গেছে, কারো গৃহপালিত গরু-ছাগল-ভেড়া-মহিষ ভাসিয়ে নিয়ে গেছে বানের স্রোত। কারো খামারের হাজারো হাঁস-মুরগির প্রাণ গেছে। কেউ আবার দংশিত হয়েছেন সাপের কামড়ে। এরসাথে হাজারো মানুষ একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে এখন দিশেহারা।
জানা গেছে, শুধুমাত্র কৃষিনির্ভর লাখের বেশি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবারের বন্যায়। মৎস খাতের ক্ষতি হয়েছে শতকোটি টাকার বেশি। প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতি ৬০ কোটি টাকার বেশি। এছাড়া প্রায় তিনশ কিলোমিটার সড়ক, হাজার হাজার বাড়ি ঘর, বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যা পরবর্তী সময়ে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ারও আশংকা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষি, মৎস, প্রাণিসম্পদ, আবাসন ও অবকাঠামো খাতে প্রায় সব উপজেলাতেই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঁশখালী, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগড়া ও সীতাকুণ্ড উপজেলা। এসব উপজেলায় তদারকি সংস্থাগুলো ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক তালিকা করলেও পুরোপুরি পানি নেমে যাওয়ার পর চুড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়া যাবে বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক আপ্রু মারমা জানান, জেলায় ১ লাখ ২২ হাজার ৬৮৫টি কৃষিনির্ভর পরিবার বন্যায় নানাভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। কারো চাষ করা ধান নষ্ট হয়েছে, কারো ফসল কিংবা বীজতলা নষ্ট হয়েছে। জেলায় মোট ১৬ হাজার ৯৪ হেক্টর ফসলের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে আউশের জমি ৯ হাজার ৪৩ হেক্টর, আমনের বীজতলা ৯৬০ হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন সবজি ৫ হাজার ৯৩৪ হেক্টর, আদা ৪০ হেক্টর, হলুদ ৩২ হেক্টর, পান ৮১ হেক্টর বন্যায় নষ্ট হয়েছে। ক্ষতির বেশিরভাগই দক্ষিণ চট্টগ্রামে। চুড়ান্ত প্রতিবেদনে এই সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।
চট্টগ্রাম জেলা মৎস কর্মকর্তা সালমা বেগম জানান, প্রাথমিক হিসেবে জেলায় মৎস বিভাগের ১০৯ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এরমধ্যে ১২ হাজার ২৫১টি পুকুর-দিঘি ও ৩২০টি ঘের পানিতে তলিয়ে মাছ ভেসে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালীতে। ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫১ কোটি টাকার বেশি। এছাড়াও অন্য উপজেলায়ও কমবেশি ক্ষতি হয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলমগীর জানান, জেলায় প্রাণিসম্পদ খাতে ৬০ কোটি ৬ লক্ষ ৮১ হাজার ১৪০ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এরমধ্যে গুরত্বপূর্ণ পশুখাদ্য খড় নষ্ট হয়েছে ১৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকার বেশি, ঘাস নষ্ট হয়েছে ৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকার, হাঁস মুরগির খামার খাতে ১৭ কোটি ২ লাখ টাকার বেশি, গবাদি পশুর খামার খাতে ১২ কোটি ৬৫ লাখের বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া ৩ কোটি ১২ লাখ টাকার বেশি মুরগী ও ৪২ লাখ টাকার বেশি মূল্যের গরুর মৃত্যু হয়েছে।
সড়ক বিভাগ জানিয়েছে, বন্যার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক, চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকার সড়ক ছাড়াও দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার আঞ্চলিক সড়কগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন ২০টি সড়কের ৫০.৫৬ কিলোমিটার এবং স্থনীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন ৫১৪টি সড়কের ২৪৭.৬৫ কিলোমিটার অংশ, ১৭৬টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাগুলো।
এদিকে বন্যায় সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায় বিপুল পরিমাণ ঘরবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকার মাটির ঘর অধ্যুষিত এলাকাগুলোর প্রায় সব ঘরই বন্যার পানিতে ডুবে থাকায় ভেঙ্গে গেছে। এছাড়া ওই উপজেলার অন্যান্য এলাকা এবং সাতকানিয়া উপজেলায় অনেক কাঁচাবাড়ি, আধাপাকা বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও স্থানীয় প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের পুর্নাঙ্গ তালিকা এখনো তৈরী করতে পারেনি।
জানতে চাইলে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান জানান, প্রাথমিক হিসেবে সাতকানিয়ায় ২ হাজার ৪৮০টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে পুরোপুরি পানি নামায় এখনো চূড়ান্ত হিসাব পাওয়া যায়নি।
সাতকানিয়ার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঁশখালী উপজেলার বাড়িঘর। স্থানীয় ইউএনও মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকায় মাটির ঘর অধ্যুষিত হওয়ায় সেখানকার বেশিরভাগ ঘরই পানিতে ডুবে ভেঙ্গে গেছে। যেগুলো টিকে আছে সেগুলোও থাকার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কয়েকদিনের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ির তালিকা তৈরী করা হবে।’
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ জুলাই থেকে টানা বৃষ্টি, বন্যা, পাহাড়ী ঢল ও পাহাড়ধ্বসে এ পর্যন্ত ছয় শিশুসহ ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে বন্যার পানিতে ডুবে। এছাড়া গত সোমবার পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় সাপের কামড়ে আহত হয়েছেন ৮৫ জন। নানা কারণে আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন আরো বেশ কিছু রোগী।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানান, অনেক এলাকায় পানি নেমে গেলেও নলক‚পের ভেতের জমে থাকা ময়লার কারণে বিশুদ্ধ পানির সংকট এখনো কাটেনি। কিছু এলাকার নলকূপ এখনো পানির নিচে ডুবে আছে। ফলে বন্যা পরবর্তী সময়ে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ারও আশংকা রয়েছে।
