বাবেল মান্দেবে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হুতি, কোণঠাসা সৌদি-সমর্থিত বাহিনী
অনলাইন ডেস্ক
লোহিত সাগরের উপকূল ধরে হুতি যোদ্ধাদের দ্রুত অগ্রযাত্রার ফলে বাবেল মান্দেব প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছে গেছে গোষ্ঠীটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, হুতিদের এই সামরিক অগ্রগতি একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের কৌশলগত প্রভাব ও দরকষাকষির শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ড্রায়াড গ্লোবালের প্রধান নির্বাহী কোরি র্যানস্লেম জানিয়েছেন, হুতি এমন একটি সামরিক বিজয় অর্জন করেছে যা তাদের বাবেল মান্দেবের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আরও কাছাকাছি নিয়ে গেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রণালিটিতে হুতিদের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা তুলনামূলক সহজ হবে, কারণ হরমুজ প্রণালির মতো এখানে যুক্তরাষ্ট্রের পর্যাপ্ত প্রত্যক্ষ সামরিক উপস্থিতি নেই।
তিহামা অঞ্চলের সংকীর্ণ সমভূমিতে কয়েক দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর বৃহস্পতিবার সৌদি আরবপন্থী ইয়েমেনি বাহিনীকে পরাজিত করে হুতি ঐতিহাসিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরের বন্দরনগরী মোখা দখল করে নেয়। আরব সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে জানা গেছে, পুরো দিনজুড়েই হুতি একের পর এক অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনে। লোহিত সাগরের মাঝে ইরিত্রিয়ার মুখোমুখি অবস্থানে থাকা হানিশ দ্বীপপুঞ্জেও তারা সেনা মোতায়েন করেছে। পাশাপাশি হুতি বাহিনী ক্রমান্বয়ে দক্ষিণে বাবেল মান্দেব প্রণালি এবং পেরিওম দ্বীপের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তবে খোলা সমভূমির মধ্য দিয়ে এই বিশাল অগ্রযাত্রার পরও হুতির ঠেকাতে সৌদি আরব বা তার ইয়েমেনি মিত্রদের শক্তিশালী বিমান হামলার অনুপস্থিতি সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর ভেতরের সমন্বয় নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।
হাতছাড়া হওয়া মোখা শহরটির নিয়ন্ত্রণে ছিল ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারেক সালেহ। তিনি ইয়েমেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহের ভাতিজা, যিনি প্রায় এক দশক আগে হুতির সাথে জোট বাঁধার পর তাদের হাতেই নিহত হয়েছিলেন। তারেক সালেহের এই সুসজ্জিত সামরিক বাহিনী আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমর্থিত হলেও চলতি বছরের শুরুর দিকে তারা সৌদি আরবের আনুগত্য গ্রহণ করে। এক দশক আগে হুতির উৎখাতে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত যৌথ সামরিক জোট গঠন করলেও পরবর্তী সময়ে সুদানের যুদ্ধ, ইসরায়েল নীতি এবং ইয়েমেনি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন করা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ফাটল ধরে। এ বছরের শুরুর দিকে আরব আমিরাত ইয়েমেন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে দাঁড়ানোর পর আবু ধাবি-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সামরিক ও আর্থিক দায়িত্ব সৌদি আরবের কাঁধে এসে পড়ে। একজন পশ্চিমা কূটনীতিক জানিয়েছেন, সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যে পুনরায় সম্ভাব্য অর্থায়ন ভাগাভাগির বৈঠক চলাকালেই হুতির এই বড় আকারের আক্রমণ চালায়, যদিও ওই বৈঠকগুলো কোনো সমঝোতা ছাড়াই স্থবির হয়ে পড়েছিল।
সৌদি আরবের সাথে মাসব্যাপী চলমান উত্তেজনার মধ্যেই হুতির এই আকস্মিক ও সর্বাত্মক হামলা শুরু হয়। ইতিপূর্বে হুতির সৌদির জ্বালানি অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছিল, যার জবাবে সৌদি ও তাদের মিত্ররা হুতি-নিয়ন্ত্রিত আল-হুদায়দাহ বন্দর দখলের জন্য পাল্টা হামলা চালায়। তবে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর এটাই হুতির সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান। সংশ্লিষ্ট কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অভিযানের পেছনে দুটি বড় লক্ষ্য কাজ করছে। বাবেল মান্দেবে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করার মাধ্যমে হুতি এখন আগের চেয়ে অনেক নিখুঁতভাবে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অবরোধ নিশ্চিত করতে পারবে এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের নজরদারি বাড়াতে পারবে। ইতিপূর্বে বিশ্বের প্রায় ১২ শতাংশ তেল পরিবাহিত হতো এই লোহিত সাগর দিয়ে, কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ব্যাপক আধিপত্যের কারণে সৌদি আরব যখন বিকল্প পথ হিসেবে এটি ব্যবহার শুরু করে, তখন এই অঞ্চলের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। লোহিত সাগরে চলাচলের জন্য হুতি মূলত একটি টোল বা শুল্ক দাবি করতে চায়, ঠিক যেমনটি হরমুজ প্রণালিতে ইরান বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। তবে সৌদি আরব শুরু থেকেই এই ধরনের কোনো শুল্ক পরিশোধে কঠোর অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে।
গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একাধিক বিধ্বংসী বিমান হামলা চালালেও হুতি অত্যন্ত দ্রুত নিজেদের সামরিক পুনর্গঠন সম্পন্ন করে। খবর রয়েছে যে ইয়েমেনে ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে পারদর্শী লেবানিজ, ইরানি, সিরীয় ও ইরাকি সামরিক বিশেষজ্ঞদের মোতায়েন করা হয়েছে, পাশাপাশি ইরান সরাসরি সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে হুতির সহায়তা নিশ্চিত করেছে।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইয়েমেন বিষয়ক গবেষক ইব্রাহিম জালাল জানান, এই পুরো বিষয়টি পারস্য উপসাগরের দুটি প্রধান সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের বার্ষিক মূল এজেন্ডার সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সাথে এটি হুতির নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকেও চরিতার্থ করে, যার মাধ্যমে তারা সৌদি আরবের কাছ থেকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করতে চায়। বর্তমানে হুতি বাবেল মান্দেব প্রণালির দিকে নজর রাখার মতো সর্বোচ্চ পাহাড়ি চূড়াগুলো নিজেদের দখলে নিয়েছে, যার ফলে এখন নজরদারি চালানো যেমন সহজ হবে, তেমনি এডেন উপসাগরের যেকোনো লক্ষ্যবস্তুতে সহজে আঘাত হানাও তাদের জন্য ত্বরান্বিত হবে।
সূত্র: মিডলইস্ট আই
