বিড়ালপ্রীতি! বনসাই সংস্কৃতি এবং রাজনীতি!

গোলাম মাওলা রনি
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিড়াল পুষতেন আর গণভবনে সেই বিড়ালকে জনারণ্যের বাঘ-সিংহরূপী লোকজন কীরূপে তোয়াজ-তদবির করতেন তা নিয়ে বলার আগে শেখ হাসিনার আরেকটি গুণের কথা বলা আবশ্যক। তিনি বনসাই আবাদ এবং পরিচর্যা করতেন। বড় বড় বৃক্ষ বিশেষত বটবৃক্ষের মতো গাছকে ছোট টবের মধ্যে কেটেছেঁটে বামন আকৃতির বটবৃক্ষ বানিয়ে তা দ্বারা শোভাবর্ধনের মধ্যে তার কী আনন্দ ছিল তা নিয়ে নিশ্চয়ই আলোচনা করব। তবে বিড়াল নিয়ে আমার নিজের জীবনে কত যে ঘটনা ঘটে চলেছে তার কিছু উদাহরণ না দিলেই নয়।
আমার বন্ধু ইমদাদ দেশের সর্বোচ্চ আদালতের অত্যন্ত সফল একজন সিনিয়র উকিল। গুলশানের অভিজাত এলাকায় প্রায় ৫ হাজার বর্গফুটের প্রাসাদসম বাসভবনে তিনি থাকেন। তিনি অতি যতনে দুইখানা বিড়াল পোষেন। একটি সাদা অপরটি কালো। বিড়ালের খাদ্য-বিনোদন-আরাম-আয়েশের জন্য তিনি করেন না এমন কর্ম নেই। তিনি বিড়ালগুলোকে যথেষ্ট সম্মান-তোয়াজ-তদবির করে পশুপ্রেমের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। তিনি ওগুলোকে আসেন-বসেন অর্থাৎ আপনি বলে সম্বোধন করতেন। দ্বিতীয়ত তার সাদা বিড়ালটির বিয়ের বয়স হয়েছে এবং সম্ভবত সঙ্গীর অভাবে সেটির মন খারাপ হবে, এ জন্য অতি যত্ন করে জামাই আদরে আরেকটি কালো বিড়াল বাসায় নিয়ে এলেন। তারপর কালো বিড়ালের সাজগোজ, খাওয়াদাওয়া, আদার-আপ্যায়ন সবকিছুই করলেন নতুন জামাইয়ের মতো। কিন্তু হঠাৎ যে কী হলো- আমার বন্ধুটিকে ধোঁকা দিয়ে কালো বিড়ালটি পালিয়ে গেল।
বন্ধু আমার অভিমানে খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিলেন। পশুরাও যে মানুষের মতো অকৃতজ্ঞ, ধোঁকাবাজ ও নিষ্ঠুর হতে পারে তা ভেবে উকিল সাহেবের মন ক্রমশ খারাপ হতে থাকল। ওদিকে কালো বিড়ালের বিরহে সাদা বিড়ালটির মন খারাপ হলো। বন্ধুর তিন ছেলেমেয়ে বৈঠকে বসল। বড় মেয়ে কানাডা থাকে। পোষা প্রাণী সম্পর্কে তার বিস্তর অভিজ্ঞতা। সুতরাং সে পরামর্শ দিল, ফেসবুকে ৫ হাজার টাকা মূল্যের একটি বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য। বিড়ালের ছবিসহ বিজ্ঞাপনটিতে বলা থাকবে- বিড়ালের সন্ধানদাতাকে যথাযোগ্য পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হবে। সবকিছু ঠিকঠাক কিন্তু আমার বন্ধুটি বেঁকে বসলেন। তার যুক্তি এমন বেইমান বিলাইয়ের জন্য আহাজারি করা ঠিক না। এত আদরযত্ন! এত সুন্দর বাসভবন-খানাপিনা এবং সুন্দরী স্ত্রী রেখে সে বদমাশ গৃহত্যাগ করতে পারে, তার জন্য বিজ্ঞাপন-টাকা খরচ এবং পাওয়া গেলে আবার বাসায় স্থান দেওয়া মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
1111আমার বন্ধুর ওপর তার কানাডাপ্রবাসী জ্যেষ্ঠ কন্যার যথেষ্ট প্রভাব। পিতাকে রাজি করানোর জন্য সেই কন্যা কোরআন-হাদিস ঘেঁটে বিড়ালের পক্ষে অনেক যুক্তি-তথ্য-উপাত্ত হাজির করল এবং পিতাকে ভয় দেখাল যে তার নিষ্ঠুর মনমানসিকতার জন্য কিয়ামতে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। বন্ধু তার কন্যার কথায় ভয় পেয়ে গেলেন। ফেসবুকে বিজ্ঞাপন ছাপা হলো- কয়েক দিন পর পাশের বাড়ির দারোয়ান কালো বিড়ালের সন্ধান দিয়ে ৪ হাজার টাকা পুরস্কার লাভ করল। পরবর্তী সময়ে সেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ভ্যাকসিন প্রদান ইত্যাদি কর্মে বহু অর্থ ব্যয় করে তাকে নতুন করে বরণ করে নেওয়া হলো।
আমার বন্ধু অ্যাডভোকেট ইমদাদুল হক কাজীর বিড়ালকাণ্ডের পর আমার নিজের জ্যেষ্ঠ সন্তান রিয়াদের কাহিনি বলে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কাহিনিতে চলে যাব। আমার তিন সন্তান- রিয়াদ-নন্দিতা-রিসাদের বিড়ালপ্রীতি সেই ছোটবেলা থেকেই। রাস্তা থেকে রুগ্ণ-অসহায় বিড়ালের বাচ্চা ধরে এনে আদরযত্ন করে বড় করার পর সেগুলো যখন পালিয়ে যেত তখন ছেলেমেয়েদের দুঃখ দেখে আমারও মন খারাপ হতো। ওরা বিড়ালের যত্ন-আত্তি করত কিন্তু বিড়ালের পায়খানা পরিষ্কার করতেন আবার স্ত্রী। এ জন্য প্রায় প্রতিদিন আমাকে স্ত্রীর মধুর সম্ভাষণ শুনতে হতো। তিনি বলতেন যেমন পাগল বাপ, তেমনি পোলাপানগুলাও হইছে- মহাপাগল। আমি আর গু-মুত পরিষ্কার করতে পারব না। এখন থেকে বুইড়্যা পাগলকে ওসব করতে হবে নইলে ল্যাদা পাগলগুলো করবে।
আমার স্ত্রীর মধুর ভাষণগুলো নিখুঁত এবং বিশুদ্ধ বরিশাইল্যা ভাষায় বর্ষিত হতো বিধায় আমরা সবাই ওগুলোকে বজ্রপাতের চেয়েও ভয়ংকর মনে করতাম। তো একদিন বজ্রাহত হওয়ার পর বাচ্চাদের বললাম, আজ থেকে বিড়ালের গু নিজেরা পরিষ্কার করবে নইলে বিড়াল বাসা থেকে বের করে দেবে। রাতে বাসায় ফিরে আমাকে যেন তোমার আম্মুর মধুমাখা উচ্চাঙ্গসংগীত শুনতে না হয়। পিতৃভক্ত সন্তানরা ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেল। তারা বৈঠকে বসল এবং অনেক চিন্তা করে উদ্ভাবন করল যে যদি কালো চশমা পরে, হাতে গ্লাভস লাগিয়ে এবং মুখে মাস্ক ব্যবহার করে বিড়ালের বর্জ্য স্পর্শ করা হয়, তবে তো কেল্লাফতে।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিউমার্কেট থেকে সবকিছু কিনে আনা হলো এবং আমার জ্যেষ্ঠ পুত্র যার উপাধি ছিল বাঘা (বাঘের চেয়েও শক্তিশালী এবং রাগী) তার নেতৃত্বে তিন সন্তান বীরদর্পে বিড়ালবিষ্ঠা স্পর্শ করতে গেল। কিন্তু স্পর্শ করার আগেই তারা ঘৃণায় বমি করে পুরো অঞ্চল সয়লাব করে আম্মার ভয়ে অন্য রুমে গিয়ে ভিতর থেকে ছিটকানি বন্ধ করে পিঠ বাঁচানোর জন্য পালিয়ে রইল। আমাকে হোম মিনিস্টার ফোন দিলেন। সব কাজকর্ম ফেলে বাসায় এলাম এবং তার পরের ইতিহাস আশা করি সম্মানিত পাঠকদের আন্দাজ করতে কোনো অসুবিধা হবে না বিধায় ওসব নিয়ে বিস্তারিত না লিখে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কাহিনি শুরু করি।
আমজনতার বিড়াল পালন আর রাজাবাদশার বিড়াল পালনের মধ্যে যে কী তফাত তা নিয়ে যদি কেউ গবেষণা করতে চান তবে শেখ হাসিনার জমানার সেই সৌভাগ্যবতী কিংবা সৌভাগ্যবান বিড়াল-বিড়ালীর দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড খাওয়াদাওয়া ইত্যাদি সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে পারেন। সেই বিড়ালের দাপট-বর্ণনার জন্য আমি ইতোপূর্বে বাংলাদেশ প্রতিদিনে একটি রাজকীয় বিড়ালের আত্মকথা শিরোনামে কলাম লিখেছিলাম ২০১১ কিংবা ২০১২ সালে। তখন যেহেতু আমি শাসক দলের একজন সংসদ সদস্য ছিলাম সেহেতু রাজ অন্তঃপুর, রাজদরবারের সদর অন্দর সম্পর্কে অনেক কিছু জানার সুযোগ হয়েছিল। সুতরাং সেই জমানার গণভবনের বিড়ালটির আদর, যত্ন, মানসম্মান, ভাবসাব দেখে আমার ভারি হিংসে হয়েছিল, বড় বড় মন্ত্রী-এমপি, আমলা-কামলারা বিড়ালটিকে কোলে নিয়ে আদর করার জন্য লাইন দিত। অনেকে গণভবনের নিচতলার সিঁড়ির গোড়ায় যেভাবে তীর্থের কাকের মতো দাঁড়িয়ে থাকতেন আর ভাবতেন- আহা কখন বিলাই মহোদয় দোতলা থেকে নামবেন এবং তাদের চাকরিবাকরি, রুটিরুজি, পদপদবি, পদোন্নতির উপলক্ষ পয়দা করে দেবেন।
আপনারা যদি গণভবনের বিড়ালের সৌভাগ্যের বাস্তব দৃশ্য দেখতে চান তবে বিখ্যাত একটি চলচ্চিত্র দেখতে পারেন। কারবালার যুদ্ধ- ইমাম হোসাইনের শাহাদাতবরণ এবং তৎকালীন জাজিরাতুল আরবের রাজনীতি নিয়ে তৈরি সিনেমাটির নাম দ্য মেসেঞ্জার বা বার্তাবাহক। তৎকালীন ইরাক ও পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের শাসক-আবদুল্লাহ বিন জিয়াদের রাজদরবারের একটি অনবদ্য ও বাস্তব দৃশ্য যেভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ওমন মুনশিয়ানা আমি বিশ্ব চলচ্চিত্রের নামকরা অন্য কোনো চলচ্চিত্রে দেখিনি। বিতর্কিত খলিফা ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া বানর পুষতেন এবং তিনি যখন রাজদরবারে বসতেন তখন তার পোষা বানরটির জন্য সিংহাসনের পাশে ছোট একটি সিংহাসন রাখা হতো এবং উপস্থিত অভ্যাগতরা বানরটিকে যথাযোগ্য কুর্নিশ করত।
খলিফা মুয়াবিয়ার বিশ্বস্ত সেনাপতি ও গভর্নর ছিলেন আবদুল্লাহ বিন জিয়াদ। ইরাক ও পূর্বাঞ্চলীয় সব রাজ্য যথা নজদ-হাইল-হেজাজ ও ইয়েমেনের শাসকরূপে কুফা নগরী থেকে আবদুল্লাহ বিন জিয়াদ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। তিনি কুফার রাজদরবারে তাঁর মনিব ইয়াজিদের অনুকরণে একটি বানর পুষতেন। সেই বানরের বাঁদরামি এবং বানরকে কেন্দ্র করে কুফার রাজদরবারের আমির ওমরাহ সিপাহি কতোয়ালদের বাদরামির চিত্রায়িত দৃশ্য দেখলেই আপনারা গণভবনের বিড়ালের অবস্থা বুঝতে পারবেন।
বিড়াল পোষা ছাড়াও শেখ হাসিনা বনসাই আবাদ করতেন। তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী এক মন্ত্রী আমাকে সতর্ক করার জন্য বনসাইয়ের কাহিনি বলেছিলেন। আমি তখন কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লিখি। হররোজ সভাসমিতি সেমিনারে গিয়ে প্রথাবিরুদ্ধ তিতা কথা বলি আর টেলিভিশনে গিয়ে বোকার মতো এমন সব কথা বলি, যা কিনা-কারও কারও মতে দলের বিরুদ্ধে চলে যেত এবং অনেক দুর্নীতিবাজ আমলা-কামলা-রাজনীতিবিদের আঁতে ঘা লাগত। সে কারণে আমার এই শুভার্থী মন্ত্রী বললেন, আরে মিয়া বেশি ফডর ফডর কইরো না। তোমার নেত্রী বনসাই আবাদ করে। দলের বড় বড় বাঘ-সিংহকে বিলাই বানিয়ে রাখে। যারা বেশি বাড়তে চায় ডালপালা বিস্তার করে তাদের ছেঁটে-ছুটে বনসাই বানিয়ে রাখে। ওমুকরে দ্যাখো তমুকের কী অবস্থা! তোমার ফডর ফডর বন্ধ করতে তার এক মিনিটও লাগবে না আর তখন অন্যদের মতো বিলাই কোলে নিলেও কাজ হবে না। বিলাইয়ের গু পরিষ্কার করে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।
আমার শুভানুধ্যায়ী সাবেক মন্ত্রী এখন কোথায় আছেন কীভাবে আছেন জানি না। তার কথামতো আমি ফডর ফডর বন্ধ করিনি, আবার বড় বড় বাঘা নেতার মতো বনসাই হয়ে দলীয় আঁস্তাকুড়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে হয়নি। অথবা ঠেলায় পড়ে গণভবনের বিড়াল কোলে নিয়ে পিঠ বাঁচানোর চেষ্টা করতেও হয়নি। আমি আছি আমার মতোন করে কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সবাই অনেক কিছুই চিন্তা করছেন। অথচ আমার মনে ওসবের চেয়ে ঐতিহ্যবাহী গণভবনের বিড়াল আর বনসাইয়ের কথা মনে হচ্ছে। এসবের পেছনে চলমান রাজনীতি এবং ক্ষমতার পালাবদলের যেই লাউ সেই কদুর সংস্কৃতি যেমন দায়ী তদ্রুপ ক্ষমতার কেন্দ্রে নতুন বিড়াল এবং নতুন বনসাইয়ের আবির্ভাবও কম দায়ী নয়।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights