বিদেশি কোম্পানির কমিশন এজেন্ট

বিশেষ প্রতিনিধি

১ নভেম্বর, ২০১৫। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আকারের বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটে। যার কারণে প্রায় গোটা দেশ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছিল। এ বিপর্যয়টিকে ‘ব্ল্যাকআউট’ নামে অভিহিত করা হয়। এ বিপর্যয়ে প্রায় ১৫ কোটি মানুষ বিদ্যুৎহীন অবস্থায় ছিল। জাতীয় গ্রিডে ত্রুটির কারণে ঘটেছিল এ বিদ্যুৎ বিপর্যয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ বিপর্যয় হিসেবে পরিচিত। এ বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পর এক সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন ড. আহমদ কায়কাউস। এ বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের তদন্ত করতে গিয়ে দেখা যায়, এ জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়টা ঘটেছিল ভারতের কারণে। ভারত জাতীয় সঞ্চালন লাইনে যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছিল, সেখানে ত্রুটির কারণে এ বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটে। ভারতের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী এ বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ভারতের। কিন্তু আহমদ কায়কাউস তদন্ত প্রতিবেদন এমনভাবে তৈরি করেন, যাতে ভারতের দোষ ঢাকা পড়ে যায়। বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে ভারতকে দায়ী না করে একটি মনগড়া বানোয়াট প্রতিবেদন জমা দেন তিনি। ড. কায়কাউস এরকম একটি ভিত্তিহীন প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন ভারতীয় কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন পেয়ে। এখান থেকেই আহমদ কায়কাউসের বিদেশিদের সঙ্গে অবৈধ লেনদেনের দ্বার উন্মোচিত হয়। ড. কায়কাউস যখন বিদ্যুৎ সচিব তখনই বিদ্যুতের বড় বড় বিদেশি বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আদানি গ্রুপের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার জন্য তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ চুক্তির মধ্যে একটি ভয়ংকর ত্রুটি ছিল। শুল্ক ও কর অব্যাহতির মাধ্যমে ভারতের আদানি গ্রুপকে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার কর ফাঁকির সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এখন দুর্নীতি দমন কমিশন এ বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের কাছে আসা তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরকে পাশ কাটিয়ে তৎকালীন সরকার বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করে আদানিকে এ সুযোগ করে দেয়। অভিযোগ আছে, বড় ধরনের এ কর ফাঁকির ঘটনার নেপথ্যে মূল ভূমিকায় ছিলেন ড. আহমদ কায়কাউস। সেই সময় তিনি বিদ্যুৎ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি এ ধরনের চুক্তি তৈরিতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বাধ্য করেন।

আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যাবতীয় রেকর্ডপত্র এবং ক্রয় চুক্তি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এতে সরকারি নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। এনবিআরের কাস্টমস ও গোয়েন্দা অধিদপ্তরের একটি দলের তদন্তে এ সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ প্রবেশ ও সঞ্চালনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি আদানি। আমদানির যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের অংশ হিসেবে কোনো বিল অব এন্ট্রি দাখিলের প্রমাণ পায়নি তদন্ত দল। তাছাড়া আইনি পন্থায় নিষ্পত্তি না করারও প্রমাণ পাওয়া গেছে। ফলে কর ফাঁকির বিপুল অর্থ পিডিবির কাছ থেকে আদায়ের সুপারিশ করেছে এনবিআরের তদন্ত কমিটি। দুদকের অনুসন্ধান দল এনবিআর কমিটির সেই তদন্ত প্রতিবেদন বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের নির্ধারিত মূল্য এবং তার শুল্ক কর আদায় যোগ্য কি না, প্রযোজ্য হলে শুল্ক কর পরিশোধ করা হয়েছে কি না এবং শুল্ক করের ছাড়ের বিষয়ে এনবিআরের অনুমোদন ছিল কি না এবং এ ধরনের কোনো ছাড় দেওয়া থাকলে এ-সংক্রান্ত যাবতীয় রেকর্ডপত্র তথ্যাদি এবং আদানি গ্রুপের সঙ্গে পিডিবি চুক্তি খতিয়ে দেখার জন্য শুল্ক ও গোয়েন্দা অধিদপ্তর কর্তৃক ৯ সদস্যের কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনের কপি চেয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধান টিম আদানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে শুল্কসংক্রান্ত বিষয়গুলো কীভাবে সম্পাদন করা হয়েছে, তাতে কোনো ত্রুটি ছিল কি না, শুল্ক পরিহার বা প্রত্যাহারের বিষয়ে রয়েছে কি না এমন কিছু তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে। উল্লেখ্য যে, এনবিআরের তদন্ত প্রতিবেদন ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই পর্যন্ত ভারতের আদানি গ্রুপ থেকে আমদানি বিদ্যুতের বিপরীতে ৩৯ কোটি ৭৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৬৭ ডলারের শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২৩ সালের ৯ মার্চ ঝাড়খণ্ডের গড্ডায় স্থাপিত আদানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু করে বাংলাদেশ। তখন থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের শুল্কসহ অন্যান্য কর পরিশোধ করা হয়নি। এনবিআর তার তদন্তে দেখতে পেয়েছে ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় আদানির কাছ থেকে পিডিবির বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে শুল্ক অব্যাহতি দিয়েছে। তবে এ বিষয়ে এনবিআরসহ যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া হয়নি।

পিডিবির সূত্র জানান, চুক্তির আওতায় গেল বছরের জুলাই পর্যন্ত আদানির কেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৫৮ কোটি ৮৯ লাখ ৯০ হাজার ৮৪ কিলোমিটার বিদ্যুৎ আমদানি করেছে বাংলাদেশ। যার মোট মূল্য ১২৮ কোটি ১৮ লাখ ৪৩ হাজার ৪৪২ ডলার। এর বিপরীতে ৩১ শতাংশ আমদানি শুল্ক ও বিভিন্ন শুল্ক মিলে ৩৯ কোটি ৭৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৬৭ ডলারের শুল্ক কর পাওয়ার কথা এনবিআরের। চুক্তিতে শুল্ক কর অব্যাহতি দেওয়া হলেও সেটির অনুমোদন নেওয়া হয়নি এনবিআর থেকে।

এনবিআরের সূত্র জানান, আমদানি করা বিদ্যুতের শুল্ক কর মওকুফসহ কোনো চুক্তি ছিল কি না এবং থাকলেও এ বিষয়ে কোনো প্রজ্ঞাপন বা আদেশ জারি হয়েছিল কি না তা জানতে চাইলে শুল্ক গোয়েন্দাকে লিখিত জবাব দেয় পিডিবি। সেখানে বলা হয়, আদানি পাওয়ার ঝাড়খণ্ড লিমিটেড ও বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বাস্তবায়িত চুক্তি অনুযায়ী ২০২২ সালের ১৪ আগস্ট তৎকালীন এনবিআরের চেয়ারম্যানের কাছ থেকে আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর প্রযোজ্য যাবতীয় শুল্ক ও কর্মক্ষেত্রের আবেদন করে। এ ক্ষেত্রে ভারতীয় বিদ্যুৎ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এনটিপিসি বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেডকে দেওয়া শুল্ক অব্যাহতির কথা তুলে ধরা হয়। তবে এনবিআরের শুল্ক অব্যাহতি ও প্রকল্প সুবিধা শাখা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালের ১৩ এপ্রিল চুক্তিতে থাকা শুল্ক কর অব্যাহতি বিষয়ে চুক্তি সম্পর্কে সম্পাদনের আগে এনবিআরের কোনো মতামত নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চেয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিবকে চিঠি দেওয়া হলেও তার জবাব দেননি তিনি। উল্লেখ্য, গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান আইন, ২০১০ এর অধীনে সম্পাদিত চুক্তিগুলো পরিচালনা করার) জন্য একটি জাতীয় কমিটি গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। ৩ অক্টোবর ভারতের আদানি পাওয়ারসহ বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে সরবরাহ-সংক্রান্ত ১১টি চুক্তি খতিয়ে দেখার কথা জানায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের চুক্তি পর্যালোচনায় গঠন করা এই রিভিউ কমিটি। এর মধ্যে আদানি পাওয়ারে নির্মিত ১৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সম্পর্ক ক্ষমতাসম্পন্ন গোড্ডা পাওয়ার প্লান্টও রয়েছে। শুধু আদানিকে ৪ হাজার কোটি টাকার শুল্ক মওকুফ করে দিয়ে আহমদ কায়কাউস অন্তত ৫০০ কোটি টাকা কমিশন বাণিজ্য করেছেন বলে একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছেন। এই পুরো টাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জমা করেছেন কায়কাউস।

শুধু আদানি গ্রুপ নয়, ভারত এবং চীনের বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকেও কমিশন গ্রহণ করতেন আহমদ কায়কাউস। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে বিদেশি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি করার ক্ষেত্রে অতিউৎসাহী ছিলেন আহমদ কায়কাউস। তিনি যখন বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তিনি দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে বিদেশি কোম্পানির দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন। এ সময় চীনের একাধিক প্রতিষ্ঠান, সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠান এবং মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করার জন্য আহমদ কায়কাউসের উদ্যোগে বিদেশে ‘রোড শো’ আয়োজন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বেশ কিছু বিদেশি কোম্পানিকে যেমন কুইক রেন্টাল দেওয়া হয়েছিল, ঠিক তেমনই বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ চুক্তি স্বাক্ষর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

বিদেশি কোম্পানিগুলোর প্রতি আগ্রহের কারণ হিসেবে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এর ফলে বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ কর ছাড় দিতে হয়েছে। বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অর্থনৈতিকভাবে। বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। আর এসব কর্মকাণ্ডে শুধু লাভবান হয়েছেন একজন। তিনি হলেন আহমদ কায়কাউস। বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করার ক্ষেত্রে আহমদ কায়কাউসের উৎসাহের প্রধান কারণ হলো, এ টাকা দেশ থেকে বিদেশে যাবে না, বরং বিদেশি কোম্পানি সরাসরি আহমদ কায়কাউসের পছন্দের ঠিকানায় বা কোম্পানিতে জমা করে দেন। ফলে দেশে তিনি একটা ক্লিন ইমেজ তৈরি করে রাখেন। এসব বিদেশি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে তিনি বিদেশ বসে চুক্তি করেন। চুক্তিপত্র এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে ওই কোম্পানিগুলো সরাসরি কমিশনের টাকা বিদেশের অ্যাকাউন্টে দিয়ে দিতে পারে।

শুধু বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে নয়, জ্বালানি ক্ষেত্রেও জ্বালানি আমদানির জন্য আহমদ কায়কাউস বিদেশিদের প্রতি নির্ভরতা বাড়ান। তার কারণেই দেশীয় গ্যাস উত্তোলন কার্যক্রমকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্পট টেন্ডারিং প্রথা চালু হয়। স্পট টেন্ডারের মাধ্যমে আহমদ কায়কাউস কমিশন বাণিজ্যের নতুন পথ উদ্ভাবন করেন। বিদেশি কোম্পানির কাছে অত্যন্ত প্রিয়ভাজন ছিলেন ড. আহমদ কায়কাউস। কারণ বিদেশি কোম্পানিগুলো সহজেই তার সঙ্গে কথা বলতে পারত এবং তাদের আর্থিক লেনদেন খুব সহজে হতো। আহমদ কায়কাউস ২০১৮ সালের পর থেকে আস্তে আস্তে এত বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন যে তাকে ম্যানেজ করতে পারলেই আর সরকারের কাউকে দরকার হতো না। একাই তিনি সবকিছু সামাল দিতেন। এ কারণেই বিদেশি কোম্পানিগুলোর অলিখিত কমিশন এজেন্টে পরিণত হয়েছিলেন আমলাদের এই মাফিয়া সর্দার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights