বিদ্বেষমুক্ত হৃদয় নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম

শায়খ আহমাদুল্লাহ

মানবচরিত্রের যত খারাপ দিক আছে, তার মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ সবচেয়ে ক্ষতিকারক ও ভয়ংকর। পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে বিষাক্ত করে তোলে। হিংসা আগুনের মতো। আগুন যেমন শুকনো কাঠকে মুহূর্তেই ভস্ম করে ফেলে, তেমনই হিংসা-বিদ্বেষ মানুষের নেক আমলকে সমূলে বিনষ্ট করে দেয়। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা হিংসা-বিদ্বেষ থেকে বেঁচে থাকো। কেননা, হিংসা মানুষের পুণ্যগুলো এমনভাবে খেয়ে ফেলে, যেভাবে আগুন লাকড়িকে জ্বালিয়ে নিঃশেষ করে দেয় (আবু দাউদ)।’

হিংসা-পরশ্রীকাতরতা বান্দার হকের অন্তর্ভুক্ত। কারও প্রতি হিংসা করা মানে তার হক নষ্ট করা। সুতরাং কারও প্রতি হিংসা করলে তার থেকে ক্ষমা নিতে না পারলে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। চুরি, ডাকাতি, হত্যা, জিনা-ব্যভিচারকে আমরা বড় পাপ হিসেবে জানি। এগুলো বড় পাপ বটেই। কেউ এ ধরনের পাপে জড়িত হলে আমরা তাকে যেভাবে পাপী মনে করি, ঘৃণা করি। সে তুলনায় হিংসা-বিদ্বেষকে পাপ মনে করি না। বরং অনেকে হিংসা-বিদ্বেষ নিজের ভিতরে সযত্নে লালন করে। অথচ এটি অত্যন্ত ভয়ানক ও সংক্রামক ব্যাধি।

দৈনন্দিন জীবনে মানুষ বহুবিধ উপলক্ষ থেকে একে অপরের প্রতি হিংসাত্মক ও বিদ্বেষী হন। যেমন অন্যের উন্নতি কিংবা সাফল্যে দেখে, শত্রুতা কিংবা দাম্ভিকতার কারণে, নেতৃত্ব বা ক্ষমতার আকাক্সক্ষাসহ নানা কারণে একে অপরের প্রতি হিংসাত্মক মনোভাব তৈরি হয়। এমন মানসিকতা লালন উচিত নয়। এ ধরনের মানসিকতা মূলত আল্লাহর প্রতি এক ধরনের অসন্তুষ্টির বহিঃপ্রকাশ। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যা দান করেছেন, তারা কি সে কারণে মানুষকে হিংসা করে (সুরা নিসা)?

আল্লাহ কাকে কতটুকু নিয়ামত দেবেন তা একান্তই তাঁর ইচ্ছা। আমাদের উচিত, আল্লাহ যাকে যতটুকু দিয়েছেন, তার ওপর সন্তুষ্ট থাকা এবং কৃতজ্ঞ থাকা। আর যদি অন্যের নিয়ামত দেখে অন্তরে জ্বালা অনুভব করি, তবে আমরা নিজের ক্ষতি করছি এবং নিজের আমল নষ্ট করছি।

এর ফলশ্রুতিতে কেবল পরকালই নষ্ট হয় না, দুনিয়াতেও মানুষের মানসিক প্রশান্তি হারিয়ে যায়। হিংসুক ব্যক্তি কখনো মানসিকভাবে সুখী হতে পারে না। অন্যের ভালো থাকার খবর শুনে যখন কারও ভিতরে অস্থিরতা তৈরি হয়, তখন সেই অস্থিরতা তাকে তিলে তিলে ধ্বংস করে দেয়। ইসলামি জীবন দর্শনে জান্নাতি মানুষের গুণাবলি বর্ণনায় অন্তরের পবিত্রতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোরআনের বর্ণনায় জান্নাতিরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবেন, আল্লাহ তাদের অন্তর থেকে সব ধরনের বিদ্বেষ ও ঘৃণা দূর করে দেবেন (সুরা আরাফ)।

অর্থাৎ জান্নাত হলো এমন জায়গা যেখানে কোনো হিংসুক বা বিদ্বেষপরায়ণ হৃদয়ের স্থান নেই। তাই জান্নাতি মানুষ হতে চাইলে, সবার আগে হৃদয়কে কলুষমুক্ত করতে হবে। একজন সাহাবির কথা হাদিসে এসেছে, যাকে আল্লাহর রসুল (সা.) জান্নাতি বলে ঘোষণা করেছিলেন কেবল এ কারণে, তিনি কারও প্রতি বিদ্বেষ রাখতেন না এবং আল্লাহ যাকে যে নিয়ামত দিয়েছেন সে ব্যাপারে হিংসা করতেন না (মুসনাদে আহমাদ)।

হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত থাকতে কিছু কার্যকর আমল জরুরি। প্রথমত, কারও প্রতি ঘৃণা তৈরি হলে তার জন্য আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা। শয়তান যখন অন্যের অমঙ্গল কামনা করতে প্ররোচনা দেয়, তখন বেশি বেশি তার কল্যাণের দোয়া করা। এতে শয়তান পরাজিত হয় এবং হৃদয়ে লালিত ঘৃণা গলে ভালোবাসায় পরিণত হয়। দ্বিতীয়ত, পারস্পরিক সালামের প্রসার ঘটানো। রসুল (সা.) বলেছেন, আমি কি তোমাদের এমন আমলের কথা বলব না যা করলে তোমাদের মাঝে ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে? তোমরা সালামের প্রসার করো (মুসলিম)।

এ ছাড়া অন্যের হিংসা থেকে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় সুরা ফালাক এবং সুরা নাস পাঠের অভ্যাস করা উচিত। সুরা ফালাক এবং সুরা নাসে হিংসুকের অনিষ্ট ও কুমন্ত্রণাদাতার থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। জৌলুসপূর্ণ ও দীর্ঘ নফল ইবাদতের চেয়ে আল্লাহর কাছে হৃদয়ের একাগ্রতা ও শুদ্ধতা অনেক বেশি পছন্দ। কিয়ামতের দিন সাফল্য লাভ করবে সেই ব্যক্তিরা যারা আল্লাহর কাছে সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন হৃদয় নিয়ে উপস্থিত হবে (সুরা শুআরা)।

নফল ইবাদত অবশ্যই সওয়াবের কাজ এবং আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার আমল। কিন্তু নফল কম আদায় করলেও হিংসা-বিদ্বেষ ও পরশ্রীকাতরতা থেকে বেঁচে থাকা অনেক বেশি জরুরি। কারণ এগুলো বান্দার হক। আল্লাহর হক আদায় না করলে আল্লাহ চাইলে ক্ষমা করে দিতে পারবেন। কিন্তু বান্দার হক বান্দা ক্ষমা না করলে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। মহান আল্লাহ আমাদের নির্মল ও সুন্দর হৃদয়ের অধিকারী হওয়ার তৌফিক দিন।

♦ জুমার মিম্বর থেকে

গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম তানঈম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights