বিপুর ৯৮ ব্যাংক হিসাবে ঘুষের টাকা
নিজস্ব প্রতিবেদক
সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর ৯৮টি ব্যাংক হিসাবে ৩ হাজার ১৮১ কোটি ৫৮ লাখ ৮৩ হাজার টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ ছাড়া তার ৩৬ কোটি ৩৬ লাখ ৯৭ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদের খোঁজ পেয়েছে সংস্থাটি।
এ ছাড়া জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বিপু ছাড়াও তার স্ত্রী সীমা হামিদ ও ছেলে জারিফ হামিদের নামে পৃথক মামলা করেছে দুদক। প্রতিটি মামলায় আসামি হয়েছেন নসরুল হামিদ। গতকাল দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে সংস্থাটির উপ-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান মামলাগুলো করেন। এদিকে বেলা সোয়া ৩টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব জানান সংস্থাটির মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন। তিনি জানান, দুর্নীতি ও ঘুষের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ বা সম্পত্তির অবৈধ উৎস গোপন করার উদ্দেশে হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তর করায় দুদক আইন-২০০৪-এর ২৭(১) ধারা, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় বিপুর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। দুদক বলছে, দ্বিতীয় মামলায় আসামি হয়েছেন নসরুল হামিদ বিপু ও তার ছেলে জারিফ হামিদ। এ মামলায় জারিফের বিরুদ্ধে ২০ কোটি ৮৭ লাখ ৬৬ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি তার ২০টি ব্যাংক হিসাবে ২৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা জমা ও ১৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা উত্তোলন হয়েছে। এই লেনদেন অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক। যা মানি লন্ডারিং অপরাধ। পাশাপাশি নসরুল হামিদের প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে তার ছেলে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের মালিকানা অর্জন করেছেন।
ক্ষমতার জোড়ে বিপুর লুটপাট বাণিজ্য : সূত্র জানায়, মিটার উৎপাদন করে দরপত্র ছাড়াই সরাসরি সরবরাহের জন্য দুটি নতুন সরকারি কোম্পানি তৈরি করা হয় নসরুল হামিদের নির্দেশে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে বাংলাদেশ স্মার্ট ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (বেসিকো)। বিতরণ খাতের ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) ৫১ শতাংশ ও চীনের হেক্সিং ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড ৪৯ শতাংশ শেয়ার নিয়ে বেসিকোর নিবন্ধন নেয় ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে। হেক্সিংয়ের স্থানীয় প্রতিনিধি হলেন নসরুল হামিদের বন্ধু ও রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামীন। বাংলাদেশ পাওয়ার ইক্যুইপমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড (বিপিইএমসি) নামে আরও একটি কোম্পানি তৈরি করা হয় স্মার্ট প্রিপেইড মিটার তৈরির জন্য। বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতের রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) ৫১ শতাংশ শেয়ার ও চীনের সেনজেন স্টার ইনস্ট্রুমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড ৪৯ শতাংশ শেয়ার নিয়ে এটি নিবন্ধিত হয়। সেনজেন স্টারের স্থানীয় প্রতিনিধি নসরুল হামিদের আত্মীয় মাহবুব রহমান ওরফে তরুণ।
দুদকের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, উৎপাদনের বদলে আমদানি করে মিটার সরবরাহ করে ওই দুটি কোম্পানি। বাজারদরের চেয়ে বেশি আমদানি মূল্য দেখিয়ে বিদেশে টাকা পাচার করেছে তারা। দরপত্র ছাড়াই বিভিন্ন সংস্থায় সরাসরি মিটার সরবরাহের সুযোগ পেয়েছে তারা। বেসিকোর মিটার সরবরাহ কার্যক্রম নিয়ে ২০২১ সালে একটি নিরীক্ষা কার্যক্রম চালায় ওজোপাডিকো। এতে দেখা যায়, নিজেরা তৈরির কথা থাকলেও আমদানি করে মিটার সরবরাহ করেছে তারা। আর আমদানি বাণিজ্যের আড়ালে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়তি দেখিয়ে ৩৬ কোটি টাকা পাচার করেছে বেসিকো। এর পর টাকা পাচারের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে ২০২২ সালের জুলাইয়ে একটি চিঠি দেন ওজোপাডিকোর তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) রতন কুমার দেবনাথ। ওই একই সময়ে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হেক্সিংয়ের বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়। এর পর ওই বছরের সেপ্টেম্বরে মামলা তুলে নিতে ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিতে নির্দেশনা দেয় ওজোপাডিকোর বোর্ড। অক্টোবরে আবেদনের পর নভেম্বরে মামলাটি প্রত্যাহার হয়ে যায়। ওই সময় বোর্ড সভাপতি ছিলেন বিদ্যুৎ বিভাগের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব নূরুল আলম। যিনি পরে জ্বালানি বিভাগের সচিব হন। টাকা পাচারের বিচার থামানোয় তিনি ভূমিকা রেখে পুরস্কৃত হয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করেছে।
