বিমানের কাছে ৬টি উড়োজাহাজ বিক্রি করতে চায় বোয়িং

বিশেষ প্রতিনিধি :

বাংলাদেশের পতাকাবাহী বিমান পরিবহন সংস্থা ‘বিমান বাংলাদেশ’ এয়ারলাইনসের কাছে ছয়টি ওয়াইড বডি এয়ারক্রাফট বিক্রি করার প্রস্তাব দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি বোয়িং। এর মধ্যে চারটি যাত্রীবাহী বোয়িং-৭৮৭ এবং দু’টি মালবাহী (ফ্রেইটার) বোয়িং-৭৭৭ রয়েছে। এদিকে ইউরোপের উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারক কোম্পানি এয়ারবাসের প্রস্তাব নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় চলছে। এমন প্রেক্ষাপটে বিমানকে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনায় রাজি করার প্রচেষ্টা হিসেবে ঢাকা সফর করে গেলেন কোম্পানির ভারত ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তারা চান, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে তাদের প্রস্তাবের ‘যথাযথ’ মূল্যায়ন হোক।

গত মঙ্গলবার ঢাকার একটি হোটেলে বোয়িং কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। আলোচনায় বিমানের সঙ্গে বোয়িংয়ের সম্পর্ক, বোয়িংয়ের নিরাপত্তা নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগ ও এয়ারবাসের প্রস্তাবসহ দুই উড়োজাহাজ নির্মাতার তুলনামূলক আলোচনা ও অর্থায়নসহ নানা দিক উঠে আসে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন বোয়িংয়ের ভারত ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট রায়ান উয়্যার, ইউরেশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশের বিপণন বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অশ্বীন নাইডু ও বোয়িংয়ের বিক্রয় পরিচালক কান্তি ভুবনাগিরি।

বোয়িংয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, অন্য কোনো নির্মাতার চেয়ে তাদের উড়োজাহাজের দাম কম এবং পুরো প্রস্তাব আর্থিকভাবে সাশ্রয়ী। এর ফলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বিমান লাভবান হবে। সে ক্ষেত্রে আগের মতো এবারও যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অর্থায়ন করতে অর্থাৎ ঋণ দিতে আগ্রহী।
যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) এর মূল্যায়নে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) মান উন্নয়ন না হওয়ায় অনেক বছর হল ঢাকা থেকে নিউইয়র্ক রুটে বিমানের ফ্লাইট বন্ধ রয়েছে। সেই বাধা কাটাতে আবারও সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বোয়িংয়ের কর্মকর্তারা। এফএএ ক্যাটাগরি-২ থেকে ক্যাটাগরি-১–এ বেবিচকের উত্তরণে নিজ খরচে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারা।

বোয়িং ভাইস প্রেসিডেন্ট রায়ান উয়্যার সাংবাদিকদের বলেন, ‘পণ্য মূল্যায়নে আমরা সব সময়ই নিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করি। যে অপারেটরগুলো বোয়িং ৭৮৭ মডেলের উড়োজাহাজ ব্যবহার করছে, তারা সেটি মূল্যায়ন করেছে। প্রকৃতপক্ষে আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা হচ্ছে ৭৮৭, যা বিক্রির পর আবারও কিনতে বায়না করছে অনেকে। বিমানের কাছে বিক্রয় প্রস্তাবগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন চাই আমরা। আশা করি, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই সেটি হবে। এটা বিমানকে ভবিষ্যতে দীর্ঘ সময়ের জন্য অনেক সহায়তা পেতে সাহায্য করবে। আমরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে দেখা করেছি। আমাদের প্রস্তাবটি পুরোপুরি মূল্যায়নের অনুরোধ করেছি। তারা বলেছেন, করবেন।’

প্রসঙ্গত, বর্তমানে বিমানের বহরে থাকা ২১টি উড়োজাহাজের মধ্যে ১৬টি বোয়িংয়ের। অন্য পাঁচটি স্বল্পপাল্লার ড্যাশ-৮০০ উড়োজাহাজ রয়েছে। প্রথমবারের মতো বহরে এয়ারবাস যুক্ত করার আলোচনা চলছে, যা অনেক দূর এগিয়েছে বলে খবরে এসেছে।

এর আগে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় এসে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। ইউরোপের এ নির্মাতা কোম্পানির উড়োজাহাজ কেনার ব্যাপারে অগ্রগতিও হয়েছে। গত মাসে বিমানের পর্ষদ সভায় তাদের প্রস্তাব যাচাই-বাছাই, দর কষাকষিসহ ক্রয় প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নিতে ১১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এ অবস্থায় বোয়িং চাইছে, তাদের প্রস্তাবটিও পুরোপুরি মূল্যায়ন করুক বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ। এর আগে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস বাংলাদেশের কাছে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ বিক্রির প্রস্তাব নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করে।

উড়োজাহাজ বিক্রিতে বিমানকে আর্থিক সুবিধার প্রস্তাবের বিষয়ে নাইডু বলেন, আমরা বিমানের সামনে একটি পুরোপুরি বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তাব দিয়েছি। তবে সেটা আমাদের ও গ্রাহকের মধ্যেই সীমিত। আর ঋণের বিষয়ে ইউএস এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক মূল্যায়ন করেছে। বিমানের আগের উড়োজাহাজগুলো কেনার ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ করেছিল তারা। সেটি খুব ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে। অতি সম্প্রতি ৭৭৭ উড়োজাহাজের সব টাকা পরিশোধ করেছে বিমান। এবারও ব্যাংকটি আগ্রহ দেখিয়েছে।

আলোচনায় খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহের বিষয়টি উঠে আসে। বিমান বোয়িংনির্ভর হয়ে পড়লে যদি কোনো সময় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়, তাহলে কি বোয়িং খুচরা যন্ত্রাংশ দেওয়া বন্ধ করে দেবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে রায়ান বলেন, ‘এখন তিনটি দেশের সঙ্গে আমাদের এ রকম অবস্থা বিরাজমান। এগুলো হলো রাশিয়া, ইরান ও উত্তর কোরিয়া। আমার মনে হয় না বাংলাদেশের সঙ্গে এমন কোনো সমস্যা হবে। কারণ, দুই দেশের মধ্যে একটি ভালো সম্পর্ক রয়েছে।

আগামী বছরের মধ্যে দুটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ প্রয়োজন বিমানের। সেটি কি বোয়িং সরবরাহ করতে প্রস্তুত? উত্তরে তারা বলেন, যদি অন্য কোনো কোম্পানির অর্ডার করা বিমান তৈরি থাকে, তাহলেই এ সময়ের মধ্যে সরবরাহ করা সম্ভব।

বিমানের জন্য এয়ারবাসের চেয়ে বোয়িং ভালো- এমন দাবির পেছনে যুক্তি প্রসঙ্গে বোয়িং কর্মকর্তারা বলেন, ৭৮৭ চালিয়ে এয়ারবাসের চেয়ে বছরে ৫০ লাখ ডলারের বেশি লাভ করতে পারবে বিমান। ৬ শতাংশ কম জ্বালানি, ৩০ শতাংশ কম রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, প্রতিযোগিতামূলক সময়ে সরবরাহ করার প্রস্তাব রয়েছে। বোয়িংয়ের পণ্য অন্য প্রতিযোগীদের চেয়ে দামেও কম। তাছাড়া বিমান মিশ্র বহরে গেলে অযথা ১৫০ মিলিয়ন ডলার লোকসান করবে।

অশ্বীন নাইডু বলেন, এ বিষয় নিয়ে আমাদের বিস্তারিত সমীক্ষা আছে। মিশ্র বহর হলে আগামী ২০ বছরে এই ১৫০ মিলিয়ন ডলার তাদের বাড়তি ক্ষতি হবে। চারটি বড় বিষয় আছে প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, স্পেয়ার পার্টস এবং পাইলট প্রশিক্ষণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights