বিরল সফরে উত্তর কোরিয়া যাচ্ছেন শি জিনপিং

অনলাইন ডেস্ক
বিরল সফরে উত্তর কোরিয়া যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। আগামী সপ্তাহে এই সফর অনুষ্ঠিত হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে সাম্প্রতিক সময়ে পৃথক আতিথ্য দেওয়ার পর বিরল এই কূটনৈতিক সফরে যাচ্ছেন চীনা প্রেসিডেন্ট।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া শুক্রবার এ তথ্য জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শি জিনপিং আগামী সোমবার থেকে শুরু হওয়া দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করবেন। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কেসিএনএ-ও সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

২০১৯ সালের পর এটি শি জিনপিংয়ের প্রথম উত্তর কোরিয়া সফর। একই সঙ্গে এটি চলতি বছরে তার প্রথম বিদেশ সফর হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে বেইজিং তার ঐতিহাসিক কিন্তু জটিল মিত্র পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরায় উষ্ণ করার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় সীমান্ত বন্ধ থাকা এবং পরে উত্তর কোরিয়ার রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির কারণে দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা শীতলতা দেখা দিয়েছিল।

চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং গত মাসে বলেছিলেন, “চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে যেকোনও বিনিময় দুই দেশের স্বার্থ ও আঞ্চলিক শান্তি-স্থিতিশীলতার জন্য উপকারী।”

কূটনৈতিক ব্যস্ততার মধ্যেই সফর
শি জিনপিংয়ের এই সফর এমন এক সময় হচ্ছে যখন তিনি সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেছেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে তার সক্রিয়তা আরও বেড়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শি জিনপিং চলতি বছরে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১৭ জন বিশ্বনেতাকে বেইজিংয়ে আতিথ্য দিয়েছেন এবং শিগগিরই লাওসের নেতার সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া আলোচনায় সম্ভাব্য ভূমিকা
এই সফরের সময়সূচি ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে যে, শি জিনপিং হয়তো যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিতে চাইছেন।

ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে কিম জং উনের সঙ্গে তিনবার বৈঠক করেছিলেন, তবে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে ট্রাম্প আবারও সেই কূটনৈতিক উদ্যোগ পুনরায় শুরুর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের আলোচনায় উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বলে জানা গেছে।

পারমাণবিক ইস্যুতে উত্তেজনা
উত্তর কোরিয়া সাম্প্রতিক সময়ে তার পারমাণবিক কর্মসূচি আরও জোরদার করেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, কিম জং উন একটি নতুন অস্ত্র উপকরণ উৎপাদন কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন এবং দেশটির পারমাণবিক শক্তি দ্রুত বৃদ্ধি করার ঘোষণা দিয়েছেন।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পিয়ংইয়ং পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

চীন-উত্তর কোরিয়া সম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্ব
চীন উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সহায়তাকারী দেশ, যা দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বেইজিং পিয়ংইয়ংয়ের প্রধান কূটনৈতিক মিত্র হিসেবে কাজ করছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার কারণে চীনও উদ্বিগ্ন, কারণ এতে যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি ও আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ে, যা চীনের সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও নতুন সমীকরণ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর কোরিয়ার রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে, এমনকি ইউক্রেন যুদ্ধে সহায়তার জন্য সৈন্য মোতায়েনের খবরও পাওয়া গেছে।

এদিকে গত বছর ভ্লাদিমির পুতিনের পিয়ংইয়ং সফর ছিল প্রায় ২৫ বছরের মধ্যে তার প্রথম সফর, যেখানে দুই নেতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
চীনের এই সফর ১৯৬১ সালের চীন-উত্তর কোরিয়া বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সহায়তা চুক্তির ৬৫তম বার্ষিকীর সঙ্গে মিলছে। ওই চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা আজও বহাল রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শি জিনপিংয়ের এই সফর কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়, বরং পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক শক্তি রাজনীতির মধ্যেও বেইজিংয়ের অবস্থান পুনঃনির্ধারণের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। সূত্র: সিএনএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights