বিরোধের কেন্দ্রে সংস্কার পরিষদ

নিজস্ব প্রতিবেদক

সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করায় জাতীয় সংসদে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। অবিলম্বে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’র অধিবেশন ডাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রবিবার সেই ৩০তম পঞ্জিকা দিবস এবং এর সময়সীমা শেষ হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ অধিবেশন আহ্বান করা হয়নি।

অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব না থাকায় প্রধানমন্ত্রীও রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন না। রাষ্ট্রপতিও অধিবেশন ডাকতে পারেন না বলে করেননি। গতকাল জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় সংবিধান সংস্কার পরিষদের এই আলোচনা হয়। বেলা ১১টায় সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। শুরুতেই অনির্ধারিত আলোচনার জন্য দাঁড়ান জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে আলোচনা করতে চান। তখন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হলে বিরোধীদলীয় নেতাকে ফ্লোর দেওয়া হবে।

প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে শফিকুর রহমানকে মাইক দেন স্পিকার। তিনি বলেন, ‘জুলাই গণ অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত এ সংসদ স্বাভাবিকভাবে তার নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় আসেনি। একটি রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে এসেছে। এটি জারি করা হয়েছে ১৩ নভেম্বর ২০২৫। এই আদেশ অনুযায়ী ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে অধিবেশন আহ্বানের (সংবিধান সংস্কার পরিষদ) কথা রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে এই অধিবেশন ডাকা হয়নি। আমার উদ্বেগের বিষয়টি এখানে। যে পদ্ধতিতে সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা হবে সেই একই পদ্ধতিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হবে।’

জুলাই সনদ আদেশের বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আদেশে বলা রয়েছে-গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। কিন্তু এটি গঠন হয়নি। এর সময়সীমা রবিবার শেষ হয়েছে। ওই আদেশ অনুসারে আমরা একই সঙ্গে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ আমরা পেতে চাই।’ সংসদ সদস্যরা দুটি আলাদা ভোটের মাধ্যমে দুটি ক্যাপাসিটিতে নির্বাচিত হয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জুলাই আদেশ অনুযায়ী আমরা বিরোধী দলের ৭৭ জন সদস্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়েছি।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করেছেন। সংসদের বাইরে আমি অনেক জায়গায় বলেছি যে যখন সংসদ থাকে না রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। সংবিধানের ৯৩ (১)(ক) ধারায় বলা আছে, সংবিধান পরিবর্তন হবে এমন কোনো বিষয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে আসতে পারে না। সেটা জায়েজ নেই। সংবিধান সংশোধনের কোনো বিধান রাষ্ট্রপতি করতে পারেন না। কিন্তু এই আদেশটি না অধ্যাদেশ, না আদেশ। মাঝামাঝি কী জিনিস। সেজন্য আমি বলেছিলাম হয়তো নিউটার জেন্ডার হতে পারে।’ কোন বিধিতে বিরোধীদলীয় নেতাকে সময় দিয়েছেন-সেই প্রশ্ন তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, যদি জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো মুলতবি প্রস্তাব আনতে হয়, সেটার জন্য বিধি আছে। সেই বিধিতে কোনো নোটিস তিনি দিয়েছেন কি না। যদি জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে হয়, সেই বিষয়ে বিধি ৬৮ অনুসারে কোনো নোটিস দিয়েছেন কি না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা পুরো জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫, টপ টু বটম পড়েছেন।

রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর সাধারণ আলোচনা : জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির দেওয়া ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাব নিয়ে সাধারণ আলোচনা শুরু হয়েছে। এই আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দল বিএনপির সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী বলেছেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক ইতিহাসকে মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডেকে জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণের আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী। গতকাল স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন করেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম। গত বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ভাষণ দেন। সংবিধানের ৭৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিবছর সংসদের প্রথম অধিবেশন ও সাধারণ নির্বাচনের পর প্রথম বৈঠক বা অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

স্পিকারের সতর্কবার্তা : জাতীয় সংসদে দেখে দেখে বক্তব্য দেওয়া অনুমোদিত নয় বলে জানিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি সংসদ সদস্যদের না দেখে বক্তব্য দেওয়ার অভ্যাস করার অনুরোধ করেন। সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর সাধারণ আলোচনা চলাকালে জামায়াতের সংসদ সদস্য মাসুদ বিন সাঈদী ও ইসলামী আন্দোলনের সংসদ সদস্য অলি উল্লাহকে উদ্দেশ করে তিনি এ কথা বলেন। এর আগে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে এ দুজন সংসদ সদস্য কাগজ দেখে পুরো বক্তব্য দেন।

বিশেষ কমিটিতে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশ : অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাইবাছাইয়ের জন্য জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। কমিটিকে অধ্যাদেশগুলো যাচাইবাছাই শেষে ২ এপ্রিলের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

গতকাল জাতীয় সংসদ অধিবেশনে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

তিনি সংসদে উত্থাপিত অধ্যাদেশগুলো বিশেষ কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করেন। পরে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।

সংবিধান অনুযায়ী, যেকোনো অধ্যাদেশ নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপন করতে হয় এবং অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে সেগুলো পাস হতে হয়। তা না হলে সেগুলোর আইনি বৈধতা থাকে না। সে কারণে ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের অধিবেশন শুরুর দিনই অধ্যাদেশগুলো অনুমোদনের জন্য জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। সংসদে অধ্যাদেশগুলো বিল আকারে উত্থাপনের পর চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি সেদিন বরিশাল-৩ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন। কমিটি এ বিলগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাইবাছাই করবে।

উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংসদ কার্যকর না থাকায় সংবিধানের ৯৩ (১) অনুচ্ছেদের অধীনে এ অধ্যাদেশগুলো জারি করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights