বিলুপ্তির পথে দিনাজপুরের শীতল মাটির ঘর

আব্দুস সালাম, দিনাজপুর প্রতিনিধি :
দিনাজপুর জেলার গ্রাম্য মেঠো পথ ধরে হাঁটলে একসময় চোখে পড়ত সারি সারি মাটির তৈরি বাড়ি যা ছিল গরমে শীতল আর শীতে উষ্ণতার প্রতীক। কিন্তু কালের স্রোতে আর আধুনিকতার দাপটে সেই মাটির ঘরগুলো এখন বিলুপ্তির পথে। ইটের ভাঁটা আর সিমেন্টের দালানের ভিড়ে চাপা পড়ে যাচ্ছে মাটির তৈরি এই পরিবেশবান্ধব আশ্রয়গুলো, সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার হাজারো শৈশবের স্মৃতি।

একসময় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের প্রধান ভরসা ছিল এই মাটির ঘর। বাড়ির ভিটে তৈরি থেকে শুরু করে দেওয়াল গাঁথা সবকিছুতেই ছিল স্থানীয় কারিগরদের নিপুণ হাতের ছোঁয়া। মাটির তৈরি এই ঘরগুলো মজবুত হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকরও ছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায়ও এগুলোর স্থায়িত্ব ছিল যথেষ্ট। কিন্তু বিগত এক দশকে দৃশ্যপট বদলে গেছে দ্রুত। মানুষ এখন সামান্য খরচে হলেও পাকা বাড়িকেই সামাজিক মর্যাদা ও আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে দেখছে।

বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, মাটির ঘর হারানোর পেছনে কয়েকটি কারণ মুখ্য: রক্ষণাবেক্ষণের চ্যালেঞ্জ: প্রতি বছর বর্ষার আগে মাটির দেওয়াল মেরামত করা এবং লেপে দেওয়ার কাজটি অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। অন্যদিকে, পাকা ঘর একবার তৈরি করলেই বছরের পর বছর নিশ্চিন্ত থাকা যায়।

স্থায়িত্বের অভাব: অতিবৃষ্টি বা বন্যায় মাটির ঘরের দেওয়াল ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা পাকা ঘরের ক্ষেত্রে নেই।

সামাজিক মনোভাব: গ্রামের মানুষ এখন মনে করে, মাটির ঘরে থাকা মানে আর্থিক দুর্বলতার প্রতীক। তাই ধারদেনা করেও তারা পাকা ঘর নির্মাণে আগ্রহী হচ্ছে।

নির্মাণ শ্রমিকের অভাব: মাটির ঘর তৈরি করার মতো দক্ষ কারিগর এখন কমে গেছে। নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আসতে চাইছে না।

এই পরিবর্তন নিয়ে সবচেয়ে বেশি আক্ষেপ প্রবীণদের। দিনাজপুর সদর উপজেলার ৩ নং ফাজিলপুর ইউনিয়নের প্রবীণ বাসিন্দা, আজীম উদ্দীন (৭৫), দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, এই মাটির ঘরেই আমার জন্ম, আমার ছেলে-মেয়েদেরও। ছোটবেলায় গরমে যখন পাকা ঘরে হাঁসফাঁস লাগত, তখন আমাদের মাটির ঘরের ঠাণ্ডা মেঝেতে শুয়ে শান্তি পেতাম। এখন নতুন প্রজন্ম টিনের চালা আর পাকা দালান ছাড়া কিছু চেনে না। মনে হয় যেন আমাদের অতীতটা মাটি চাপা পড়ে গেল।

স্থানীর প্রবীণরা আরও জানান, দিনাজপুরের এই নীরব পরিবর্তন শুধু কয়েকটি ঘরের বিলুপ্তি নয়, এটি আবহমান বাংলার একটি জীবনযাত্রার পদ্ধতির বিলুপ্তি। আধুনিকতার দৌড়ে আমরা হয়তো অনেক সুবিধা পাচ্ছি, কিন্তু হারাচ্ছি আমাদের শেকড়ের এক অমূল্য সম্পদ। এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে সচেতনতার অভাব আজ প্রকট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights