বিশ্বকাপের উন্মাদনায় ভাসছে দুনিয়া, কিন্তু গাজা?

অনলাইন ডেস্ক

একদিকে যখন উত্তর আমেরিকার আধুনিক সব স্টেডিয়ামে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মহারণ, বিশ্বকাপ ২০২৬-এর পর্দা উঠছে, ঠিক তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সমান্তরাল পৃথিবীতে দিন কাটছে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার ক্রীড়াবিদদের। ইসরায়েলি আগ্রাসনে লণ্ডভণ্ড গাজা সিটির ফিলিস্তিন স্টেডিয়ামের অবশিষ্ট অংশে এখন আর আগের সেই জৌলুস নেই। তবে সেখানেই ক্রাচে ভর দিয়ে ফুটবল পায়ে বল নিয়ে ছুটছেন আলি তাফেশ ও তার সতীর্থরা। তারা ‘গাজা আল-ইরাদা’ বা গাজার ইচ্ছা নামের একটি ফুটবল ক্লাবের সদস্য, যার প্রতিটি খেলোয়াড়ই যুদ্ধে অঙ্গ হারানো একেকজন অদম্য মানুষ। এই দলের ফুটবলারদের কাছে খেলাধুলা এখন আর কেবল বিনোদন বা ক্যারিয়ার নয় বরং সব হারিয়ে বেঁচে থাকার এবং নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ সম্বল।

মাত্র চার বছর আগে ২০২২ সালে কাতারে যখন বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তখন গাজার এক ক্যাফেতে বন্ধুদের নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে খেলা উপভোগ করেছিলেন ২৪ বছর বয়সী আলি তাফেশ। সে সময় তিনি ছিলেন একজন দ্রুতগতির দৌড়বিদ, যাঁর ঝুলিতে ছিল একাধিক মেডেল। কিন্তু ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাদের জেইতুন এলাকার বাড়িতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় প্রাণ হারান তার মা ও ভাই, আর ডাক্তাররা কেটে ফেলতে বাধ্য হন আলির একটি পা। আইন নিয়ে পড়াশোনা করা এই তরুণ প্রথমে জীবনের সব আশা হারিয়ে ফেললেও পরে বন্ধুদের মাধ্যমে এই ক্লাবের খোঁজ পান এবং ছয় মাস আগে আবার মাঠে নামেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতি এতটাই কঠিন যে অনুশীলনে আসার জন্য আলিকে ভাঙা রাস্তা পেরিয়ে ক্রাচে ভর দিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা হেঁটে আসতে হয়, কারণ সেখানে কোনো যানবাহন নেই। এমনকি সাধারণ বুট জুতো বা নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় নুন্যতম সরঞ্জামটুকুও তাদের কাছে নেই।

দলের আরেক অভিজ্ঞ সদস্য ৪০ বছর বয়সী সাদি আল-মাসরি অবশ্য দুই বছর বয়সে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় পা হারিয়েছিলেন। প্রতিবন্ধকতা জয় করে তিনি সাঁতার ও ভলিবলে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হন এবং প্রতিবন্ধী ফুটবল দলের হয়ে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপেও ফিলিস্তিনের প্রতিনিধিত্ব করেন। সাদি অত্যন্ত ক্ষোভ ও দুঃখের সাথে জানান যে, এবারের আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের বাছাইপর্বে তাদের অংশ নেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু যুদ্ধ তাদের স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা গাজায় নতুন স্টেডিয়াম ও একাডেমি তৈরির যে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা এখনো শুধু কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। চার বছর আগের বিশ্বকাপের সাথে বর্তমানের তুলনা করতে গিয়ে সাদি বলেন, তখন অন্তত বিদ্যুৎ ছিল, সবাই মিলে বড় পর্দায় খেলা দেখতে পারতেন। আর আজ পুরো গাজা অন্ধকার, ইন্টারনেট বা মোবাইলের স্ক্রিনে কোনোমতে স্কোর দেখা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই।

দলের কোচ হাতেম আল-মুগরেবি জানান, বিশ্বজুড়ে যখন ফুটবলের আনন্দ উৎসব চলছে, তখন গাজার খেলোয়াড়দের মনের ভেতর এক চরম একাকীত্ব ও হতাশা কাজ করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত গাজায় প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষ তাদের হাত বা পা হারিয়েছেন। ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি হামলায় গাজার ক্রীড়াঙ্গনের এক হাজারেরও বেশি খেলোয়াড়, কোচ ও কর্মকর্তা প্রাণ হারিয়েছেন এবং ধ্বংস হয়ে গেছে ২৬৫টিরও বেশি ক্রীড়া অবকাঠামো। এমন নির্মম বাস্তবতার মাঝে দাঁড়িয়েও আল-ইরাদা দলের ফুটবলাররা আশা ছাড়েননি। বিশ্ববাসীর কাছে তাদের একটাই আকুল আবেদন, স্টেডিয়ামের গ্যালারি আর মাঠের সবুজ ঘাসে যেন ফিলিস্তিনের এই কষ্টের কথা ভুলে না যাওয়া হয় এবং বিশ্ব সমাজ যেন তাদের বেঁচে থাকার ও খেলার অধিকার ফিরিয়ে দিতে এগিয়ে আসে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights