বিশ্ববাজারে স্বর্ণ-তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী, শেয়ারবাজারে ধস

অনলাইন ডেস্ক

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার হুমকি জোরালো করায় বিশ্ববাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া বক্তব্যের প্রভাবে বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণ ও তেলের দাম বেড়েছে, বিপরীতে বিশ্বের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে।

নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত স্বর্ণের দাম এদিন নতুন রেকর্ড গড়ে আউন্সপ্রতি ৫ হাজার ৫০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। একপর্যায়ে দাম বেড়ে দাঁড়ায় সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৫৮৮ দশমিক ৭১ ডলারে। এর আগে সোমবার (২৬ জানুয়ারি) স্বর্ণের দাম প্রথমবারের মতো ৫ হাজার ১০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করে।

স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার দামও নতুন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি এড়িয়ে চলার প্রবণতা এবং ডলারের তুলনামূলক দুর্বলতা মূল্যবান ধাতুর দামে এই উল্লম্ফনের প্রধান কারণ।

ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও ঊর্ধ্বমুখী। যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই ক্রুড সেপ্টেম্বরের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, আর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম উঠেছে গত আগস্টের পর সর্বোচ্চ স্তরে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাই এ বৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি।

ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ইরানকে দ্রুত আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অবিলম্বে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ আরও ভয়াবহ হতে পারে। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনের নেতৃত্বে একটি বড় নৌবহর পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

অন্যদিকে, এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। টোকিও, হংকং, সাংহাই, সিডনি ও সিউল—সবকটি প্রধান বাজারেই সূচক নেমে গেছে। ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে প্রায় ৮ শতাংশ, যা আগের দিনের বড় পতনের ধারাবাহিকতা।

আবার অন্যান্য প্রধান মুদ্রার বিপরীতে চাপে রয়েছে ডলার। যদিও মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সিএনবিসিকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই শক্তিশালী ডলারের নীতিতে বিশ্বাসী। তবে তার একদিন আগেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডলারের সাম্প্রতিক দুর্বলতা নিয়ে মন্তব্য করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ডলার ভালোই করছে।

অলস্প্রিং গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্টসের বিশ্লেষক ম্যাথিয়াস শাইবার ও রুশাভ আমিন বলেন, বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি এখন কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে। ট্রাম্প কাকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত করেন, তার দিকে। কারণ আগামী মে মাসে বর্তমান চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের মেয়াদ শেষ হচ্ছে।

এক যৌথ মন্তব্যে তারা জানান, নতুন ফেড চেয়ারম্যানের নাম ঘোষণাই বাজারের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠতে পারে। দৌড় এখনো উন্মুক্ত থাকলেও সাধারণ ধারণা হলো, জেরোম পাওয়েলের পরিবর্তে তুলনামূলকভাবে নরম মুদ্রানীতির পক্ষের কোনো ব্যক্তি দায়িত্ব নিতে পারেন।

তারা আরও বলেন, সুদের হার কমানোর বিষয়ে ফেডের ওপর সরকারের চাপ চলতি বছরজুড়েই অব্যাহত থাকতে পারে।

এদিকে বাজার বিশ্লেষক স্টিফেন ইনেস বলেন, সোনার এই অস্বাভাবিক উত্থান বাজারে আরও গভীর কাঠামোগত উদ্বেগের প্রতিফলন। তার মতে, এশীয় লেনদেনের শুরুতেই যখন সোনা আউন্সপ্রতি ৫ হাজার ৫০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করে, তখন এটি আর সাধারণ পণ্যের মতো আচরণ করছে না।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, সোনা মূলত আস্থার বিপরীত প্রতিচ্ছবি। নীতিনির্ধারণের ওপর আস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে সোনা শুধু ঝুঁকি হেজ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং বিকল্প সম্পদে রূপ নেয়। বর্তমানে বাজারে ঠিক সেই চিত্রই দেখা যাচ্ছে। এটি মন্দার আশঙ্কার চেয়ে বরং কাগুজে মুদ্রা ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তে থাকা সন্দেহেরই প্রতিফলন।

সূত্র: এএফপি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights