বেকারত্ব-দারিদ্র্য বাড়ছে, মবের অপসংস্কৃতি বড় চ্যালেঞ্জ

অনলাইন ডেস্ক

বেকারত্ব বৃদ্ধি, দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মবনির্ভর প্রবণতা—এই সবই দেশের জন্য উদ্বেগজনক সংকেত বলে মন্তব্য করেছেন বক্তারা। তাঁরা বলেন, তরুণদের কর্মসংস্থান ও টেকসই অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে শুধু পরিসংখ্যান নয়, কাঠামোগত সংস্কার, দক্ষতা উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।

গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য মুক্ত আলোচনা : তরুণদের কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ’ শীর্ষক সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) এই সংলাপের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে বেকারত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও এর বাস্তব চিত্র অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তকে বর্ণিত বেকারত্ব ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, ৪.৩৬ শতাংশ বেকারত্বের হারকে তিনি খুব বড় কোনো সংকট হিসেবে দেখেন না, কারণ শুধু শতাংশের ভিত্তিতে পরিস্থিতির পূর্ণ বাস্তবতা বোঝা যায় না। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এই ধরনের পরিসংখ্যান অনেক সময় বাস্তবতার সঠিক প্রতিফলন নয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, জুলাই-আগস্টের পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি ছিল দেশের তরুণসমাজ।

অথচ জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ তরুণ হলেও শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ছে, কর্মসংস্থান সেভাবে তৈরি হয়নি। তিনি বলেন, তরুণদের অংশগ্রহণ মানে শুধু মন্ত্রিত্ব বা সংসদে জায়গা দেওয়া নয়; একটি সুস্থ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের নেতৃত্বে ওঠার সুযোগ তৈরি করাই প্রকৃত অংশগ্রহণ।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, মব ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ, জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই, শিল্প খাত দক্ষ জনশক্তির অভাবে ভুগছে। এলডিসি উত্তরণ নিয়ে অতিরিক্ত আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ পারভেজ ইমদাদ বলেন, প্রবাস আয় ও তৈরি পোশাক খাত অর্থনীতির চালিকাশক্তি হলেও তা যথেষ্ট নয়; ডিজিটাল ডিভাইড কমিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর খাতগুলো বিকশিত করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. সায়েমা হক বিদিশা বলেন, প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থানের সামঞ্জস্য নেই। ফলে শিক্ষিত বেকার বাড়ছে এবং স্কিল মিসম্যাচ প্রকট হচ্ছে। সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, তরুণদের জন্য শুধু চাকরি নয়, টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বলেন, স্নাতক শেষ করার পর তরুণদের সবচেয়ে বড় সংকট বেকারত্ব।

১৯৭১ সালের পর থেকে রাষ্ট্র টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। দীর্ঘদিনের কোটাব্যবস্থা কাঠামোগত বৈষম্য তৈরি করেছে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া বিনিয়োগ আসবে না, কর্মসংস্থানও তৈরি হবে না বলে মন্তব্য করে তিনি ফ্যাসিবাদবিরোধী নির্বাচনের দাবি জানান।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. কামরুল আহসান বলেন, সমস্যা চাকরির অভাব নয়, বরং দক্ষতার অভাব। দক্ষতা থাকলে স্বল্প শিক্ষিত ব্যক্তিও ভালো আয় করতে পারে। রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলনের কো-অর্ডিনেটর দিদারুল আলম ভূইয়া বলেন, মাদক ব্যবসা ও দুর্নীতির মাধ্যমে তরুণদের নিষ্ক্রিয় রাখার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সঠিক বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা থাকলে গ্রামেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে গভীর অসামঞ্জস্য রয়েছে। নারীদের কর্মসংস্থান বাড়াতে ডে-কেয়ারসহ উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, প্রতিবছর সাত লাখ গ্র্যাজুয়েট শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও চাকরি পাচ্ছে মাত্র এক লাখ। তিনি বলেন, এই বাস্তবতা থেকেই তরুণদের জন্য টেকসই কর্মসংস্থান কাঠামো গড়ে তোলার তাগিদ সৃষ্টি হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights