ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা গভীর সংকটে, প্রতি ৬টি নমুনার একটিতেই ভেজাল!

অনলাইন ডেস্ক

খাবারের টেবিলে রাখা এক গ্লাস দুধ, তরকারির পনির, রান্নাঘরের মসলার কৌটা কিংবা স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে বাজারজাত করা এক প্যাকেট ছোলা; এগুলো প্রায় ভারতীয় পরিবারের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে যে ভয়াবহ তথ্য সামনে এসেছে, তাতে প্রতিদিনের এই অতিপ্রয়োজনীয় খাবারগুলোর বিশুদ্ধতা নিয়েই এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে। ৭ জুন বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা দিবসের প্রাক্কালে প্রকাশিত এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পরীক্ষা করা খাদ্য নমুনার প্রতি ছয়টির মধ্যে অন্তত একটি গুণগত মান বা নিরাপত্তা পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। এই পরিসংখ্যান শুধু একটি প্রশাসনিক সংখ্যা নয় বরং এটি ভারতের সামগ্রিক খাদ্য ব্যবস্থার এক গভীর সংকটের চিত্র তুলে ধরেছে।

খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি এখন আর কেবল আইনি নিয়মকানুন মেনে চলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন সরাসরি সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের জায়গায় আঘাত করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে সমস্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে মানুষ আগে কখনো দ্বিতীয়বার ভাবত না, এখন সেগুলো খেতেই সাধারণ মানুষ ভয় পাচ্ছে। দুধ, পনির, শস্য বা ডালের মতো পণ্যে ভেজাল ও দূষণের খবর এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আস্থার সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, যেখানে সঠিক সতর্কবার্তার সাথে প্রচুর পরিমাণে গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে বাজারে গিয়ে কোন খাবারটি নিরাপদ আর কোনটি বিষাক্ত, তা নিয়ে সাধারণ ক্রেতারা প্রতিনিয়ত চরম বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ছেন।

খাবারে এই ভেজাল ও দূষণের প্রভাব কেবল ব্যবসার ক্ষতি করছে না বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ মানবিক ও স্বাস্থ্যগত বিপর্যয়। চিকিৎসকদের মতে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৬০ কোটি মানুষ অনিরাপদ খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়। একই কারণে প্রাণ হারায় লক্ষাধিক মানুষ। ভারতের মতো জনবহুল দেশে এর পরিণতি আরও মারাত্মক রূপ নিচ্ছে, যা সাধারণ ফুড পয়জনিং বা পেটের অসুখ থেকে শুরু করে লিভার নষ্ট হওয়া এবং ক্যান্সারের মতো দীর্ঘমেয়াদী মরণব্যাধি তৈরি করছে। খাবারে ব্যবহৃত ভারী ধাতু, ক্ষতিকর কৃত্রিম রং, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ এবং শিল্পকারখানার রাসায়নিক মানুষের শরীরে ধীরে ধীরে জমা হয়ে জীবনীশক্তি ধ্বংস করে দিচ্ছে, যার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশু ও বয়স্করা।

এই ভেজাল সংস্কৃতির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সেই সমস্ত সৎ উদ্যোক্তারা, যারা বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে খাদ্য উৎপাদন করছেন। মুষ্টিমেয় কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর লোভের কারণে পুরো খাদ্য খাতের ভাবমূর্তি আজ সংকটের মুখে। যখন একটি নিম্নমানের পণ্য বাজারে চলে আসে, তখন তা সৎ ও নিয়ম মেনে চলা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতাকে অসৎ উপায়ে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এখন শুধু সাধারণ মানের পরীক্ষা নয় বরং কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে মোড়কীকরণ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে কঠোর নজরদারি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তার এই সংকটকে কেবল কারখানা বা উৎপাদনকারীদের একক সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে, কারণ এটি একটি দেশের সামগ্রিক নাগরিক ব্যবস্থার সাথে যুক্ত। নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করার বিষয়টি সরাসরি উন্নত অবকাঠামো, বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ, শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জনগণের সচেতনতার ওপর নির্ভর করে। ভারতের মতো একটি বিশাল দেশে যেখানে কোটি কোটি ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক খাদ্য ব্যবসায়ী রয়েছে, সেখানে প্রতিটি স্তরে মান বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর শাসনব্যবস্থা, জবাবদিহিতা এবং পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা আনা না গেলে এই বিশাল খাদ্য ব্যবস্থার ওপর মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই খাদ্য সুরক্ষার উদ্বেগ এখন ঘরের গণ্ডি বা রেস্তোরাঁ পেরিয়ে করপোরেট অফিসের ক্যান্টিনগুলোকেও স্পর্শ করেছে। আজকের চাকরিজীবীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন, তারা খাবারের প্যাকেটের গায়ে লেখা উপাদানগুলো পড়েন এবং পুষ্টি ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ফলে অফিসগুলোতে খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি চাপ তৈরি হয়েছে। ক্রেতাদের এই চাপের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান এখন ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে, যেখানে রান্নার পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতার ছবি তুলে প্রমাণ রাখতে হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই যুগে একটি ছোট অবহেলাও যেকোনো নামী ব্র্যান্ডের বছরের পর বছর ধরে তৈরি করা সুনাম মুহূর্তেই ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।

এই আস্থার সংকট থেকে বাঁচতে বাজারে এখন এক নতুন ধরনের সচেতনতা তৈরি হচ্ছে, যেখানে অনেক ব্র্যান্ড তথ্যের স্বচ্ছতাকেই তাদের ব্যবসার মূল হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে। ভোক্তারা এখন জানতে চান তারা আসলে কী খাচ্ছেন এবং সেই খাবারে কোনো ক্ষতিকর উপাদান আছে কি না। বাজারে এমন কিছু নতুন ব্র্যান্ডের জন্ম হচ্ছে যারা পাম অয়েল, ময়দা, কৃত্রিম প্রিজারভেটিভ বা ক্ষতিকর রং সম্পূর্ণ বর্জন করে কেবল প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে খাবার তৈরি করছে। উদ্যোক্তাদের ভয়, যদি এই ভেজাল সংস্কৃতি চলতে থাকে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্যাকেটজাত বা প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর থেকে চিরতরে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য হবে এক বড় ধাক্কা।

আইনের কঠোরতা এবং ল্যাবরেটরির সংখ্যা বাড়লেও ভারতের বিশাল জনসংখ্যার বাজারে এর সঠিক বাস্তবায়ন এখনো এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের এই দেশে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরের বড় বাজার পর্যন্ত সমভাবে আইনের প্রয়োগ করা মোটেও সহজ কাজ নয়। এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিরাপদ খাদ্যের বিরুদ্ধে ভোক্তাদের নিজেদেরই প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। খাবার কেনার সময় লাইসেন্সপ্রাপ্ত বিক্রেতা যাচাই করা, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ও উপাদান ভালোভাবে দেখে নেওয়া এবং রান্নাঘরে সর্বোচ্চ পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। একই সাথে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যেকোনো খাদ্য সংক্রান্ত মুখরোচক তথ্য যাচাই না করে শেয়ার না করার পরামর্শ দিয়েছেন পুষ্টিবিদরা, কারণ একজন সচেতন ক্রেতাই পারেন এই বিষাক্ত চক্র রুখে দিতে।

সূত্র: এনডিটিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights