ভিউবাণিজ্য : অস্তিত্বসংকটে সংগীতাঙ্গন
মোস্তফা মতিহার
নন্দনতত্ত্বের সবচেয়ে জটিল ও কঠিন মাধ্যম সংগীত। রেডিওর অনুরোধের আসরে গানের অনুরোধ, টেলিভিশনে প্রচার, ক্যাসেট বিক্রির সংখ্যা, কনসার্টে দর্শক-শ্রোতাদের উচ্ছ্বাস ও মানুষের মুখে মুখে ফেরার মধ্য দিয়েই একটি গানের জনপ্রিয়তা ফুটে উঠত। শুধু গানের জনপ্রিয়তার কারণেই অনেক সিনেমা রাতারাতি সুপারহিট হয়েছে এমন নজিরও কম নয়। কিন্তু প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় গান এখন হারিয়েছে তার স্বকীয়তা। ডিজিটাল যুগে বদলে গেছে গানের জনপ্রিয়তা পরিমাপের হিসাব। ইউটিউবে কতবার শোনা হয়েছে, কত ভিউ পেয়েছে, স্পটিফাইয়ে কত স্ট্রিম হয়েছে, কতবার ট্রেন্ডিং হয়েছে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কত রিলস তৈরি হয়েছে, এসব সংখ্যাই বর্তমানে জনপ্রিয়তার নির্ণায়ক হয়ে উঠেছে। ভিউবাণিজ্যই যেন বর্তমানে গানের জনপ্রিয়তার প্রধান মাপকাঠি। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অনেক শিল্পীর গান মিলিয়ন ও কোটি ভিউ হচ্ছে, কয়েক দিন খুব ট্রেন্ডিংয়ে থাকছে, গান দিয়ে রিলও তৈরি হচ্ছে। তবে দুঃখের বিষয় কিছুদিন পর সর্বোচ্চ ট্রেন্ডিংয়ে থাকা সেই গায়কও কালের গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছেন।
তরুণ প্রজন্মকে টার্গেট করে চটুল কথার ও বিকৃত সুরের ডিজিটাল মাধ্যমের ভিউবাণিজ্য তথা ভিউ ভাইরাসের এই সস্তা খেলায় মেতে উঠতে গিয়ে সংগীত শুধু স্বকীয়তাই হারায়নি, অস্থিরতাও তৈরি হয়েছে সংগীতাঙ্গনে। ভিউবাণিজ্যের এই নোংরা খেলা ক্ষতিকর ভাইরাসের মতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় দেশের সংগীতাঙ্গন কলুষিত হয়ে পড়েছে। এ নিয়ে শঙ্কিত দেশের সংগীতবোদ্ধা, সমঝদার, সংগীতানুরাগী ও সংগীতসংশ্লিষ্টরা। রুচিহীন, নিম্নমান সম্পন্ন ভিউবাণিজ্যের কারণে সংগীত শুধু অশুদ্ধতার কাঠগড়ায়ই দাঁড়ায়নি, আবহমান বাংলার সংস্কৃতির ওপরও আঘাত হেনেছে। যার কারণে তরুণ প্রজন্মের কাছে লালন, হাসন, পঞ্চকবি, পল্লীগীতি, জারি সারি, ভাওয়াইয়া ও ভাটিয়ালি এখন রূপকথার মতো। ভিউবাণিজ্যের এই ভাইরাসকে সংগীতাঙ্গন থেকে নির্মূল করতে না পারলে সংগীতশিল্পের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে বলে মনে করেন দেশবরেণ্য সংগীতশিল্পী, গীতিকার, সুরকার ও সংগীতবোদ্ধারা।
কোকিলকণ্ঠী-খ্যাত কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, যুগের সঙ্গে সময়ের পরিবর্তনে অনেক কিছুরই পরিবর্তন ঘটে। এখন এনালগ যুগ নেই। ডিজিটাল যুগ চলছে। আর ডিজিটাল যুগের শ্রোতাদের রুচিরও পরিবর্তন ঘটেছে। সময়কে মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। এখন এআই দিয়েও মানুষ গান তৈরি করছে। তবে ভিউ দিয়েই একটি গানের জনপ্রিয়তা নির্ণয় করা ঠিক নয়। সংগীত মানেই সাধনা। তাই প্রকৃত শিল্পী হতে গেলে সাধনার বিকল্প কিছু নেই। আর একটি ভালো গানের মান কখনো ভিউ দিয়ে নির্ধারণ করা যাবে না। কথা, সুর ও গায়কির শৈল্পিকতায় ভালো গান জনপ্রিয়তা না পেলেও তা আজীবন শ্রোতাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকে।
সংগীতজ্ঞ শেখ সাদী খান বলেন, সংগীত মানেই সাধনা। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ও একনিষ্ঠ সাধনার মাধ্যমে যারা জনপ্রিয়তা পেয়েছেন তাঁদের সঙ্গে ভিউবাণিজ্যের তুলনা করাটাও বোকামি। ভিউবাণিজ্য কখনোই একজন শিল্পীর জনপ্রিয়তার মাপকাঠি হতে পারে না। কিছু টাকার জন্য সংগীতকে বিকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এটা সংগীতের জন্য নিঃসন্দেহে ক্ষতিকর। এই ভিউবাণিজ্য সংগীতের জন্য একটা অশনিসংকেত। ডিজিটাল মিডিয়ার মাধ্যমে কেউ কেউ হয়তো টাকা কামাচ্ছে আর জনপ্রিয়তাও পাচ্ছে। তবে সেই টাকা ও জনপ্রিয়তা ক্ষণিকের। ভিউবাণিজ্য দিয়ে একটা ট্রেন্ডিংয়ে ওঠা যায়, কিন্তু টিকে থাকা যায় না। টিকটকসহ সব ধরনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গান প্রচারের জন্য সেন্সরশিপ থাকা উচিত। সরকারিভাবে এখনই না এগিয়ে এলে ও না পদক্ষেপ নিলে ভিউবাণিজ্যের সস্তা জনপ্রিয়তা সংগীতাঙ্গনের জন্য বিরাট হুমকি হয়ে দেখা দেবে।
একসময়কার জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, ‘আমাদের সময় আর বর্তমান সময়ের মধ্যে অনেক পার্থক্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংগীতেও প্রযুক্তির উৎকর্ষতা ঘটেছে। প্রযুক্তির বিষয়ে আমার অত ধারণা নেই। তবে আমি এটা বিশ্বাস করি, দিনশেষে ভালো জিনিসই টিকে থাকে।’ আঁখি আলমগীর বলেন, ভিউবাণিজ্যের মাধ্যমে সফলতার অপচেষ্টায় গানের মান যেমন নষ্ট হচ্ছে, গানও ঠিক তেমনিভাবে কলুষিত হচ্ছে। রিয়েল ও মানসম্পন্ন বিষয়ের চেয়ে ভিউতে কৃত্রিমতা ও মানহীন বিষয়কে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয় বলে গান তার সঠিক জায়গা থেকে বিচ্যুত হয়েছে। ভিউবাণিজ্যের সস্তা জনপ্রিয়তায় সংগীতাঙ্গন এখন প্রশ্নবিদ্ধ। ভিউ ব্যাপারটাই মার্জিত নয়, এটা বুস্টেড। ভিউবাণিজ্যকে প্রাধান্য দিয়ে নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটানো হচ্ছে। সামাজিক অবক্ষয়ও ঘটছে। এটা রোধ করা জরুরি। না হলে সংগীতাঙ্গন অনেক বেশি কলুষিত হয়ে পড়বে। তারুণ্যের হার্টথ্রব মিউজিক ডিরেক্টর ও সংগীতশিল্পী হাবিব ওয়াহিদ বলেন, ভিউ যেহেতু মানুষের দ্বারাই হচ্ছে সেহেতু এটা দোষের কিছু নয়। ডিজিটাল আসার আগে অ্যালবামের যুগে মানুষই গান শুনত আর বর্তমানে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মানুষই গান শোনে। সেজন্য জনপ্রিয়তার মাপকাঠিকে আমি বিভক্ত করতে চাই না। প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় মানুষ ডিজিটাল মাধ্যমের সাহায্য নিতেই পারে। তবে নিজের ক্রিয়েটিভিটি না থাকলে প্রযুক্তি দিয়ে বেশি দূর এগোনো যায় না। টিকেও থাকা যায় না।
