ভূপাতিত মার্কিন বিমান উদ্ধারে এসে হারাল আরও তিনটি

প্রতিদিন ডেস্ক

ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ভূপাতিত মার্কিন যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ দ্বিতীয় সদস্যকে (অস্ত্র কর্মকর্তা) উদ্ধারে ৩৬ ঘণ্টার রূদ্ধশ্বাস মার্কিন অভিযান শেষ হয়েছে। এ অভিযানে ওই কর্মকর্তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও মার্কিন বাহিনী হারিয়েছে দুটি ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টার এবং একটি সামরিক পরিবহন বিমান। একই সঙ্গে উদ্ধার অভিযানে অংশগ্রহণকারী কমান্ডোদের স্থানীয় ইরানি সেনাদের সঙ্গে সংঘর্ষেও জড়াতে হয়েছে। এদিকে ইরানের হামলায় একের পর এক যুদ্ধবিমান হারানোর প্রতিশোধ নিতে যুক্তরাষ্ট্র এবার তাদের অস্ত্রভাণ্ডারের সবচেয়ে ভয়ানক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছে বলে আভাস পাওয়া গেছে। সূত্র বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বুশেহর পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বুশেহরে হামলা হলে উপসাগরীয় দেশগুলোতে তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকিতে পড়বে।

আলজাজিরার এক প্রতিবেদকে বুশেহরে হামলার সম্ভাবনা সম্পর্কে বলা হয়েছে, একের পর এক যুদ্ধবিমান হারানোর পর যুক্তরাষ্ট্র এবার তাদের অস্ত্রভাণ্ডারের সবচেয়ে ভয়ানক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারের সবচেয়ে দূরপাল্লার এ ক্ষেপণাস্ত্র এরই মধ্যে ইরানের দিকে তাক করে রাখা হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের তথ্যানুযায়ী, এবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে জেএএসএসএম-ইআর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। গত মার্চের শেষ থেকেই এ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মোতায়েন শুরু করে তারা। যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে মোট ২৩০০টি জেএসএসএম-ইআর ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। যার মধ্যে বেশির ভাগই ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য মোতায়েন করা হয়েছে। এ ক্ষেপণাস্ত্র নজর এড়িয়ে নিখুঁত টাগের্টে হামলা করতে সক্ষম। এর ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা বিপুল।

নিখোঁজ কর্মকর্তার উদ্ধার অভিযান : বিবিসির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ভূপাতিত মার্কিন যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ ক্রু সদস্যকে এক দুঃসাহসিক অভিযানে উদ্ধার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল ফোর্স। দীর্ঘ ৩৬ ঘণ্টার রূদ্ধশ্বাস তল্লাশি অভিযানের পর গতকাল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ‘আমরা তাকে পেয়েছি। ইরানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার আগেই এ উদ্ধার অভিযান সম্পন্ন হয়েছে।’ প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার ইরানি আক্রমণে একটি মার্কিন এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর ওই বিমানে থাকা দুজন সদস্যের একজন (পাইলট) সেদিনই উদ্ধার হয়েছিলেন। তবে দ্বিতীয় সদস্য (অস্ত্র কর্মকর্তা) নিখোঁজ ছিলেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসের অন্যতম জটিল উদ্ধার অভিযান ছিল।

নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমার প্রিয় আমেরিকানরা, গত কয়েক ঘণ্টায় মার্কিন সামরিক বাহিনী ইতিহাসের অন্যতম সাহসী তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান চালিয়ে আমাদের অবিশ্বাস্য এক সেনাকে ফিরিয়ে এনেছে।’ তিনি জানান, কর্নেল পদমর্যাদার ওই কর্মকর্তা এখন ‘নিরাপদ ও সুস্থ’ আছেন। বৈরী পাহাড়ি এলাকায় ইরানি বাহিনীর তাড়া খেয়ে তিনি এক দিনের বেশি সময় পার করেছেন। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, নিখোঁজ সেনাকে উদ্ধারে ডজনখানেক অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান পাঠানো হয়েছিল। যদিও ওই সেনা কিছুটা আহত হয়েছেন, তবে তিনি এখন বিপদমুক্ত। ট্রাম্প আরও দাবি করেন, কোনো আমেরিকান নিহত বা আহত না হওয়া প্রমাণ করে যে ইরানি আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের ‘একচ্ছত্র আধিপত্য’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অভিযানটি নিখুঁত দাবি করলেও বাস্তবে বেশ প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়েছিল মার্কিন বাহিনীকে। নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, উদ্ধারকাজে ব্যবহৃত দুটি পরিবহন বিমান যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আটকে যায়। সেগুলো যাতে শত্রুর হাতে না পড়ে, সেজন্য মার্কিন কমান্ডোরাই বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বিমানগুলো ধ্বংস করে দেয়। পরে অতিরিক্ত তিনটি বিমান পাঠিয়ে উদ্ধারকারী দল ও আহত সেনাকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

ইরানি ড্রোন আক্রমণে কুয়েতের তেলক্ষেত্রে আগুন : কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন জানিয়েছে, ইরানি ড্রোন হামলায় গতকাল তাদের একাধিক তেলক্ষেত্রে আগুন ধরে গেছে। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কুয়েত সংবাদ সংস্থা কুনা জানায়, হামলায় একাধিক স্থানে আগুন লেগেছে। এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। এদিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে ইসরায়েলের দিকে আরও একবার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে ইসরায়েল সেনাবাহিনী সতর্ক রয়েছে।

হামলার পরপরই ইরানের মিসাইল বাংকার সচল : মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের ভূগর্ভস্থ মিসাইল বাংকার ও সাইলো (মিসাইল সংরক্ষণের ঘাঁটি) খুবই অল্প সময়ের মধ্যে আবার সচল করে তুলছে ইরান। হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মাটি খুঁড়ে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো থেকে মিসাইল লঞ্চার উদ্ধার করে ব্যবহার উপযোগী করা হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের হাতে এখনো বিপুল পরিমাণ ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ভ্রাম্যমাণ লঞ্চার রয়েছে। ফলে দেশটির সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি বলে মনে করছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ জানিয়েছে, ইরান বুলডোজার ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া লঞ্চারগুলো দ্রুত খুঁড়ে বের করছে এবং সেগুলো পুনরায় ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করছে। এদিকে বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ইরান এখনো প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০টি মিসাইল ইসরায়েলের দিকে ছুড়ছে।

ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে রাসায়নিক সতর্কতা : ইসরায়েলের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বেন গুরিয়নে একটি সন্দেহজনক প্যাকেজ থেকে ধোঁয়া বের হওয়ার ঘটনায় ‘হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়াল’ (হ্যাজম্যাট বা রাসায়নিক) সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং বিমানবন্দরের কর্মীদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আলজাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

ইসরায়েলের ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ সার্ভিস জানায়, একটি প্যাকেজ বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর সেখান থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। এ ঘটনায় দ্রুত নিরাপত্তা প্রোটোকল চালু করা হয় এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে সংশ্লিষ্ট এলাকাসহ কর্মীদের সরিয়ে নেওয়া হয়। এদিকে, বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এক বিবৃতিতে জানান, তেল আবিবের নিকটবর্তী এই বিমানবন্দরে ড্রোন ও ক্লাস্টার মিউনিশন ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এ হামলা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের অংশ এবং এতে উন্নত অস্ত্র-ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে।

নরকের দরজা খুলে যাবে : ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, ‘সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ‘নরকের শাস্তি’ ভোগ করতে হবে।’ আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে ইরানের ওপর ‘নরক নেমে আসবে’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন হুমকি দেওয়ার পর ইরান এ হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তেহরানে ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি আলিয়াবাদী সতর্ক করে বলেন, ইরানের অবকাঠামোর ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে ‘তোমাদের জন্য নরকের দরজা খুলে যাবে’। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা মেহর নিউজ এজেন্সি এ তথ্য জানিয়েছে। সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারি বলেন, ‘মনে রেখো, শত্রুতা বাড়লে পুরো অঞ্চল তোমাদের জন্য নরকে পরিণত হবে। ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে পরাজিত করার যে কল্পনা, তা এখন এমন এক জলাভূমিতে পরিণত হয়েছে, যা তোমাদেরই গ্রাস করবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights