ভূমিকম্পের আট দিন পর ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার এক ব্যক্তি!

অনলাইন ডেস্ক

ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পের আট দিন পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ৪৪ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। দীর্ঘ ৭০ ঘণ্টার জটিল উদ্ধার অভিযানের পর তাকে নিরাপদে বের করে আনেন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্ধারকর্মীরা। এই ঘটনাকে ‘অলৌকিক’ হিসেবে বর্ণনা করছেন উদ্ধারকারীরা।

উদ্ধারকৃত ব্যক্তির নাম হার্নান আলবার্তো গিল ফ্লোরেস। তিনি উপকূলীয় শহর লা গুয়ারার গালেরিয়াস প্লায়া গ্রান্দে শপিংমলের পার্কিং ভবনের ধসে পড়া প্রায় ২৯ ফুট গভীর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছিলেন। ওই শপিংমলে তিনি নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

৭০ ঘণ্টার টানা অভিযানে সফলতা
চিলির ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল উদ্ধার অভিযানে প্রায় ৭০ ঘণ্টা কাজ করার পর বৃহস্পতিবার ফ্লোরেসকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

উদ্ধারের পর তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। চিলির দমকল বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল এবং আশঙ্কামুক্ত।

মনে হয়েছিল তিনি আর বেঁচে নেই
উদ্ধারের ঠিক আগে ফ্লোরেসের স্ত্রী গুসবিমার গনসালেস সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ভূমিকম্পের পর কয়েকটি দিন ছিল তাদের পরিবারের জন্য অসহনীয় কষ্টের।

তিনি বলেন, “আমি ভেবেছিলাম, তিনি হয়তো আর বেঁচে নেই। কিন্তু যখন জানতে পারলাম তিনি জীবিত আছেন, তখন মনে হলো অন্ধকারের মধ্যে এক টুকরো আলোর দেখা পেয়েছি। তিনি একজন সত্যিকারের বীরের মতো লড়ে গেছেন।”

তিনি জানান, তাদের সন্তানরাও বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিল।

ক্যামেরায় প্রথম দেখা মেলে
বুধবার একটি বিশেষ অনুসন্ধান ক্যামেরা ধ্বংসস্তূপের নিচে নামিয়ে প্রথমবারের মতো ফ্লোরেসের অবস্থান নিশ্চিত করা হয়।

চিলির ফায়ার সার্ভিস প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, কংক্রিটের বিশাল স্তূপের ফাঁক দিয়ে তার হাতের আঙুল নড়ছে। পরে উদ্ধারকারীরা তার সঙ্গে কথা বলতে সক্ষম হন।

পাইপের মাধ্যমে দেওয়া হয় খাবার ও ওষুধ
উদ্ধারকারী দল জানায়, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা অবস্থায় ফ্লোরেসকে পাইপ ও সিরিঞ্জের সাহায্যে পানি, তরল খাবার, ওষুধ এবং শরীরে প্রয়োজনীয় স্যালাইন সরবরাহ করা হয়।

উদ্ধারের সময় ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে তার মাথা ও কাঁধ বের করে আনা হচ্ছে। তার একটি চোখ রক্তাক্ত ছিল এবং মুখে অক্সিজেন মাস্ক পরানো ছিল।

ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকির মধ্যেই অভিযান
চিলির দমকল বিভাগ জানিয়েছে, ভবনটি অত্যন্ত অস্থিতিশীল থাকায় উদ্ধার অভিযান ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনও সময় ধ্বংসস্তূপের আরও অংশ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ছিল।

জাতিসংঘের ডিজাস্টার অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন (ইউএনডিএসি) দলের সদস্য সেবাস্তিয়ান মোকোরকার বলেন, ভূমিকম্পের সাত দিন বা তার বেশি সময় পর কাউকে জীবিত উদ্ধার করা প্রায় অলৌকিক ঘটনা।

তিনি জানান, সাধারণত ভূমিকম্পের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টাকে ‘গোল্ডেন উইন্ডো’ হিসেবে ধরা হয়। এই সময়ের পর বিশেষ করে পানি না পেলে জীবিত থাকার সম্ভাবনা দ্রুত কমে যায়।

রাডার ও শব্দ শনাক্তকারী যন্ত্রে মিলেছিল সংকেত
উদ্ধারকারীরা গত রবিবার প্রথম জানতে পারেন যে ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ জীবিত থাকতে পারেন।

কোস্টারিকার রেড ক্রস জানায়, রাডার সোনার এবং শব্দ শনাক্তকারী বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে জীবিত মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল যৌথভাবে অভিযান শুরু করে।

প্রায় ছয়টি দেশের বিশেষজ্ঞরা টানা তিন দিন ধরে নিরাপদ পথ তৈরি করে ফ্লোরেসের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।

কোস্টারিকার রেড ক্রস জানায়, উদ্ধার হওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে নিয়মিত শিরায় স্যালাইন, পানি এবং শরীরের প্রয়োজনীয় তরল সরবরাহ করা হচ্ছিল।

এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলের প্রকাশ করা এক ভিডিওতে দেখা যায়, একজন উদ্ধারকর্মী পাইপের মাধ্যমে তাকে কমলা রঙের একটি তরল পানীয়- সম্ভবত ইলেকট্রোলাইট দ্রবণ- দিচ্ছেন।

ভিডিওতে উদ্ধারকর্মী তাকে জিজ্ঞেস করেন, “আপনি কি আহত হয়েছেন?”

জবাবে ফ্লোরেস বলেন, “না, আমি আহত হইনি। শুধু পাথরের চাপের কারণে খুব অস্বস্তি হচ্ছে।”

মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ২৯৫
ভেনেজুয়েলার উপকূলীয় শহর লা গুয়ারা ছিল সাম্প্রতিক জোড়া শক্তিশালী ভূমিকম্পে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি। সেখানে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান চলছিল।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই কোদাল, হাতুড়ি, এমনকি খালি হাত দিয়েই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। জ্বালানি ও উদ্ধার সরঞ্জামের সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

দেশটির জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ভূমিকম্পে অন্তত ২ হাজার ২৯৫ জন নিহত হয়েছেন। তবে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লা গুয়ারার এক ফরেনসিক চিকিৎসক জানিয়েছেন, তিনি যে অস্থায়ী মর্গে কাজ করছেন সেখানে প্রতিদিন প্রায় ৪০০টি মরদেহ গ্রহণ ও শনাক্তকরণের কাজ চলছে।

উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সূত্র: সিএনএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights