মতামতঃ ‘বিশ্ব মা দিবসে’ মায়ের স্মৃতিচারণ
মা হচ্ছে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার, যেটা না পেলে আমরা কিছুই করতে পারতাম না। এই সেই মা, যারা দীর্ঘ নয় মাস পেটে গর্ভধারণ করে, সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে আমরা পৃথিবীতে আগমন করি, যে মা আমাদের জন্য অনেক কিছু করতে পারেন, রান্না বান্না থেকে শুরু করে সন্তানকে আগলে রাখার পর্যন্ত।
সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আমাদের জন্য এক আশীর্বাদ। মায়ের দু’আর কারণেই জীবনে কোনো দুঃখ – দুর্দশা হয় না, কোনো বিপদ – আপদ হয় না। একবার আমরা যদি চিন্তা করে দেখি, যদি মা আমাদের জীবনে না আসত, তাহলে আমরা কল্পনাই করা যায় না, এমনকি আমরা পৃথিবীতে জন্মই নিতে পারতাম না। আসল কথায় আসি, আমাদের জীবনে একটা না একটা স্মৃতি থাকেই মা কে নিয়ে। কোনো সময় ভালো স্মৃতি আর কোনো সময় খারাপ স্মৃতি। ভালো খারাপ মিলিয়েই এক স্মরণীয় স্মৃতিতে পরিণত হয়। খারাপ স্মৃতি বলা আমার কাছে ভুল হবে, এটাকে বলব দুঃসময়ের সাথী। কারণ দুঃসময়ে আপনার পাশে কেউ আসবে না, আসবে শুধু আপনার মা, আপনার জন্মদাত্রী। সুতরাং, আমার কাছে মা আমার দুঃসময়ের বন্ধু।
সালটা ২০১১। আমি তখন ক্লাস ২ তে পড়তাম। আমার স্কুল ছিল সাউথ পয়েন্ট স্কুল এন্ড কলেজ। যাই হোক, আমার হঠাৎ করে চিকেন পক্স ধরা পড়ে। চিকেন পক্স জীবনে একবারই আসে। কিন্তু ওই একবারেই আমার অবস্থা অবনতি ঘটেছিল কিছু সময়ে। সামনে তখন ২য় সাময়িক পরীক্ষা। আমি পরীক্ষা দিতে পারব কিনা খুবই দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। আম্মুও অনেক দুশ্চিন্তায় পড়েছিল। ভাগ্যিস বার্ষিক পরীক্ষায় এইরকম রোগ ধরা পড়েনি, তাহলে আমি পরে পরীক্ষাই দিতে পারতাম না।
অন্যদিকে, আম্মু যখন আমার শ্রেণি শিক্ষিকার সাথে যখন কথা বললেন, তখন শ্রেণি শিক্ষিকা বললেন আমাকে বাসায় থাকতে, বাসায় বিশ্রাম নিতে বলেছেন। পরবর্তীতে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ আছে বলে আশ্বস্ত করলেন আমার শ্রেণি শিক্ষিকা। তারপর আমার মা পরীক্ষার টেনশন না করে আমার প্রতি বেশি বেশি যত্ন নিতে লাগলো। শত ব্যস্ততার মাঝেও আমার মা আমাকে সময় মত খাওয়ানো, ঔষধ নিবারণ করানো সব করিয়ে দেয়। আমার শরীর গরমে টগবগ করত রোগের কারণে। মাঝে সময়ে আমার মা জলপত্তি দিতেন, শরীর মালিশ করিয়ে দিতেন। পরীক্ষার চেয়ে আমার প্রতি টেনশনে ছিলেন। প্রায় ১-২ সপ্তাহের পর আমি আল্লাহর রহমতে ঠিক হয়ে পরি। মায়ের দীর্ঘ সেবা – যত্নে আমি ঠিক হয়ে যাই। আরেকটি ঘটনা আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাচ্ছি।
ছোটবেলা থেকে রেসলিংয়ের প্রতি শখ ছিল। আমি আর আমার বড় ভাই প্রতিদিন টিভিতে ডাব্লিও. ডাব্লিও. ই. খেলা দেখতাম। সেই সময় বিটিভিতে চলতো সন্ধ্যার দিকে। তো একদিন আমি আর আমি বড়ভাই মিলে কুস্তি খেলতে লাগলাম। খেলার সময়ে আমার মাথাটা ফেটে যায়। আমি জানালার দিকে বারি খাই। তখন আমার মাথায় রক্ত পড়ছিল। সাথে সাথে আমার মা রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এসে যখন দেখে আমার অবস্থা, তখন সাথে সাথে আমাকে নিয়ে ঔষধের দোকানে নিয়ে যায়। আমার অবস্থা আরও খারাপের দিকে ছিল। তারপর আমার মাথায় ডাক্তার সেলাই করে দেয়। আমি খালি চিন্তা করে, দেখি আর অনুভব করে এখনো। যদি আমার মা না থাকতো, তাহলে আমার জীবনটা একেবারে তছনছ হয়ে যেত। কেউ না পারুক, আমার মা ঠিকই সেবা – যত্ন করবে, অন্যান্য মায়েরা যেভাবে লালন – পালন করে।
খারাপের স্মৃতির চেয়ে ভালো স্মৃতিই আছে।
ছোটবেলায় আমি এক হুজুরের কাছে আরবী শিখতাম। আরবী বলতে সবার আগে কায়দা শেষ করে তারপর কোরআন শরীফ ধরলাম। প্রথম দিকে আমার পড়তে সমস্যা হচ্ছিল, আস্তে আস্তে ঠিক করে ফেলি। মসজিদে হুজুরের কাছে পড়তাম। একদিন আমি মসজিদ থেকে পড়া শেষ করে বাসায় ফিরলাম। হুজুর আমাকে সুরা ভালোমত পড়তে বলেছিল। পড়তে লাগলাম। আমার মা আমাকে ডেকে নিল। বললেন সুরা শুনতে। বিসমিল্লাহ পড়ার পর সুরা পাঠ করতে লাগলাম। হঠাৎ আমি খেয়াল করলাম, আমার মা কেমন জানি শান্তি অনুভব করছেন। আমি সুরা প্রথম দিকে শুরু করেছিলাম তো, তাই আমার পড়া ঠেকছিল। তারপরও আমার মা খুব মনোযোগ সহকারে শুনতে লাগলেন। শুনার শেষে মা মাশাআল্লাহ বলল। এটা আমার এক বিরাট প্রাপ্তি। তখন বুঝতাম না কোরআন এর গুরত্ব কি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি কেনো কোরআন শরীফ এত গুরুত্বপূর্ণ। কোরআন শরীফ বাবা – মার জন্য কেনো এত গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হাদিসে পাওয়া যায়। হজরত মুয়াজ জুহানি (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোরআন পাঠ করেছে এবং তাতে যা আছে সে অনুযায়ী আমল করেছে, তাহলে তার মা-বাবাকে কেয়ামত দিবসে একটি (নূরের) তাজ (টুপি) পরানো হবে। যদি সূর্য তোমাদের ঘরে প্রবেশ করত, তাহলে ওই সূর্যের আলো অপেক্ষাও ওই টুপির আলো উজ্জ্বলতর হবে। এখন তোমরা চিন্তা করো, যে ব্যক্তি কোরআনের নির্দেশ অনুসারে আমল করে, তার মর্যাদা ও অবস্থা কত উত্তম হবে?’ –(আবু দাউদ: ১৪৫৩; শুআবুল ঈমান: ১৭৯৭)। তারপর থেকে যখন আমি সময় পাই, তখন মাকে কোরআন শরীফ শুনাই। প্রথমবার মাকে কোরআন শরীফ শুনানো আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো স্মৃতি। আরও কত স্মৃতি জমে রয়েছে। যেমন, মায়ের সাথে মার্কেটে যাওয়া, তার দেওয়া মূল্যবান উপদেশ, মায়ের সাথে নানার বাড়িতে ভ্রমণ ইত্যাদি ইত্যাদি।
স্মৃতি এমন একটি জিনিষ, যেটা ভুলা অনেক সহজ না। একদিন না একদিন সেই স্মৃতি, সেই মুহুর্ত আমাদের চোখে ভাসে। মায়ের স্মৃতি অনেক আছে, মায়ের সাথে সময় কাটানোর অনেক মুহুর্ত রয়েছে। আমি ভাগ্যবান কারণ আমার মা ও আছেন। মায়ের সাথে এখনো আঁচল বেঁধে রাখি। মায়ের সাথে থাকি। মায়ের প্রতি যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করি, করছি। সবাই আমার মায়ের জন্য দোয়া করবেন। আর যাদের বাবা – মা আছে, তাদের উদ্দেশে বলব বাবা – মায়ের প্রতি যত্ন নিতে, খেয়াল রাখতে আর একটাই কথা বলব, তাদের সামনে খারাপ আচরণ করবেন না। সব শেষে বলব, মা তোমাকে অনেক ভালবাসি।
নাফিস সাকিব ইসলাম
শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
