মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকট বন্ধ না হলে বিপদের শঙ্কা রয়েছে বাংলাদেশে
আবির আবদুল্লাহ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকট বন্ধ না হলে বিপদের শঙ্কা রয়েছে বাংলাদেশের। হুমকির মুখে পড়তে পারে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহৎ শ্রমবাজার। জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়তে পারে শিল্প কারখানা থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের বাজার পর্যন্ত। ফলে দ্রব্যমূল্যের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে। এতে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠা দুষ্কর হয়ে পড়বে বলে অভিমত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের।
তারা বলছেন, বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার সিংহভাগ পূরণ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হলে বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করতে হবে। এতে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাবে। এর প্রভাব পড়বে বাজারে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আরও বাড়বে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আমাদের অর্থনীতি বেশ বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে। নানা চেষ্টা করেও সেই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছে না। এখন মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে জড়িয়ে গেলে সেটা হবে দেশের অর্থনীতির জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারের উল্লেখযোগ্য অংশ রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রায় ৩০ লাখের মতো বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করে। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব রাখে। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে জড়ালে এসব শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বেন। বন্ধ হয়ে যাবে বড় অঙ্কের রেমিট্যান্স। এ ছাড়া এসব শ্রমিক ফিরে এলে দেশে বেকারত্বের হারও বাড়বে। সেটা অর্থনীতির ওপর একটা বড় চাপ তৈরি করবে। এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক খালিদ কুদ্দুস বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বেধে গেলে বাংলাদেশ সিরিয়াস ঝামেলায় পড়বে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আসা বন্ধ হলে আমাদের বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। এতে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাবে। এর প্রভাব শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে বাজার সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়বে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার বন্ধ হলে রেমিট্যান্সে বড় ধাক্কা খাবে। যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।
তবে গত শনিবার মধ্যরাতে ইরানে সীমিত আকারে ইসরায়েলি হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়েছে বলে মনে করছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল সেটা এখন কমতির দিকে। লেবাননে যে যুদ্ধ চলছে সেটাও সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মনে করছি। সেই প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা রয়েছে। আমার মনে হয়, জাহাজ চলাচল, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলের সংকট তৈরি হওয়া কিংবা ওখানে বিভিন্ন দেশের কর্মজীবী মানুষ আছেন তাদের চলে আসার যে জনস্রোত সেটা এখন একটু কমতির দিকে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের শুরু হয় গত বছরের ৭ অক্টোবর। সেদিন ইসরায়েলে হামলা চালায় ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন হামাস। এর জবাবে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ চালায় ইসরায়েল। এ সময়ে ৪৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নাগরিক ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন। গাজার ২৩ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। পশ্চিম তীরে নিহত হয়েছেন আরও ৬০০ জন। ইসরায়েলি হামলায় ২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত ও অন্তত ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এ ধ্বংসযজ্ঞের রেশ ছড়িয়ে পড়ে লেবাননেও। লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গেও যুদ্ধে জড়ায় ইসরায়েল। এ ছাড়া পেজার বিস্ফোরণ, লক্ষ্য নির্ধারণ করে হত্যাকান্ড, দূর থেকে বোমা হামলা চালানো এবং গোয়েন্দাদের নেতৃত্বে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করে ইসরায়েল। এসব অভিযানে হিজবুল্লাহ ও হামাস প্রধানসহ ইরানের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিহত হন। এর জবাবে গত ১ অক্টোবর ইসরায়েলের বিমান ঘাঁটিসহ সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে কিছু মিসাইল অ্যাটাক করে ইরান। এতে ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক ক্ষয়ক্ষতি হয় বলে দাবি করে ইরান। তখন থেকেই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চরম উত্তেজনা শুরু হতে থাকে। এই হামলার জবাবে গত শনিবার ভোররাতে ইরানের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। এবার ইরান যদি পাল্টা হামলা চালায় তবে মধ্যপ্রাচ্যে চরম যুদ্ধ বেধে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
