মধ্যমেয়াদে সাত চ্যালেঞ্জ

রুকনুজ্জামান অঞ্জন
প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে অন্তত সাতটি চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ৯টি অনুমান ও প্রত্যাশার কথা উল্লেখ করা হয়েছে সরকারের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে। চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতি, উন্নত বিশ্বের উচ্চ সুদের হার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, জিডিপির অনুপাতে রাজস্ব আদায়ে নিম্নহার এবং খেলাপি ঋণ ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।

এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের ৯টি অনুমিতির কথা তুলে ধরা হয়েছে নীতি বিৃবতিতে। বলা হয়েছে, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বাড়বে, ডলারের বিপরীতে টাকার মান স্থিতিশীল থাকবে, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স আয়েও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। এসব ইতিবাচক দিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করবে বলে মনে করছে সরকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সামলাতে সরকারকে বাস্তবসম্মত অনুমিতির ওপর নির্ভর করে প্রয়োজনীয় কৌশল ও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিভ্রান্তিকর অনুমিতির ওপর কৌশল গ্রহণ করলে তা অর্থনীতির ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

মধ্যমেয়াদে যেসব চ্যালেঞ্জ দেখছে সরকার : সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে উল্লিখিত চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে মূল্যস্ফীতির ওপর। বলা হয়েছে, মুদ্রা ও রাজস্বনীতিতে বেশ কিছু সমন্বয় সাধন করে এটি মোকাবিলার কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে কঠোর মুদ্রা ও ব্যয় সংকোচনের কথা বলা হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি কমলেও উচ্চ সুদের হার বিরাজ করবে। বাজারে বিরাজমান উচ্চ সুদের হার প্রবৃদ্ধির গতি কমিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। কম রাজস্ব আদায়কে তৃতীয় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে বলা হয়েছে, দেশে জিডিপির অনুপাতে কর আদায় সন্তোষজনক নয়। রাজস্ব আয় বাড়াতে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। উন্নত বিশ্বে বিদ্যমান উচ্চ সুদের হারকে চতুর্থ চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এটি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আশঙ্কা করা হয়েছে উন্নত দেশগুলোর এই উচ্চ সুদহার অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে রিজার্ভ বাড়ানো কঠিন হতে পারে। খেলাপি ঋণ এবং আর্থিক খাতের শৃঙ্খলাকে পঞ্চম চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরে নীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে ব্যাংক একীভূতকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; তবে এতে সুফল পেতে সময় লাগবে। ষষ্ঠ চ্যালেঞ্জ হিসেবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের চ্যালেঞ্জটিকে ষষ্ঠ চ্যালেঞ্জ অভিহিত করে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সুবিধা হারাবে। এ চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সবশেষ জলবায়ু পরিবর্তনকে অর্থনীতির সপ্তম চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তন অর্থনীতির ক্ষতি করতে পারে। এজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অনুমান ও প্রত্যাশা : পরবর্তী অর্থবছরে অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ৯টি অনুমান ও প্রত্যাশা তুলে ধরেছে মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিৃবতিতে। এগুলো হলো : (১) কৃষি ও শিল্প উৎপাদন শক্তিশালী থাকবে এবং অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে; (২) উন্নত দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল থাকবে, যা দেশের রপ্তানি বাড়াতে সহায়তা করবে; (৩) সম্প্রতি গৃহীত উদ্যোগের ফলে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান স্থিতিশীল থাকবে; (৪) বিশ্বব্যাপী পণ্যমূল্য হ্রাস পাবে এবং বিনিময় হারের স্থিতিশীলতায় মধ্যমেয়াদে মূল্যস্ফীতি কমবে; (৫) মূল্যস্ফীতি কমলে ব্যক্তিপর্যায়ে ভোগ বাড়বে যা জিডিপি বাড়াতে সহায়তা করবে; (৬) বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা আমদানি ব্যয়ে গতি আসবে; (৭) বিশ্বজুড়ে নীতি সুদের হার কমে আসবে, যা বাংলাদেশের রিজার্ভ বাড়াতে সহায়তা করবে; (৮) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কারের কারণে কর আদায় বাড়বে এবং (৯) বিভিন্ন বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও প্রবাসী ও রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক এমকে মুজেরী বলেন, অর্থনীতিতে যেমন চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমনি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কৌশলও রয়েছে। মধ্যমেয়াদে অনেক ভালো ভালো অনুমিতি ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেছে সরকার। তবে কৃষি উৎপাদন, রপ্তানি, রেমিট্যান্স- এসব তো আর এমনি এমনি বাড়বে না; এজন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সঠিক অনুমিতির ওপর সঠিক কৌশল গ্রহণ করতে পারলে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সামাল দেওয়া যাবে; নয়তো সামনের দিনে চ্যালেঞ্জ আরও বাড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights