ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ‘গায়েব’, ২০ মাসেও চার্জশিট হয়নি

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি
হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনই ‘গায়েব’ হয়ে গেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের চাঞ্চল্যকর ইসমাইল হত্যা মামলায়। সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে প্রতিবেদন পাঠানোর আট মাস পরও সেটি তদন্ত কর্মকর্তার হাতে পৌঁছেনি। অথচ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে প্রতিবেদনটি গ্রহণের তথ্য রয়েছে। এদিকে হত্যাকাণ্ডের ২০ মাস পেরিয়ে গেলেও আদালতে দাখিল হয়নি মামলার চার্জশিট।

মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আশুগঞ্জ উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের লামা শরীফপুর গ্রামের মৃত উজির আলীর ছেলে ইসমাইল মিয়া (৬২) গত বছরের ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যার পর বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন। পরদিন তাঁর ছেলে সাদ্দাম থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, নিখোঁজের দিন রাতে ইসমাইলের সঙ্গে পাশের হোসেনপুর গ্রামের সুমনের মোবাইল ফোনে সর্বশেষ কথা হয়েছিল।

পরে সুমনের স্ত্রী শান্তা বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, একপর্যায়ে শান্তা ও তাঁর স্বামী সুমন হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেন। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হোসেনপুর গ্রামের টানাপাড়া এলাকায় নকুল পালের পরিত্যক্ত বাড়ির সিঁড়ির নিচের একটি সেপটিক ট্যাংক থেকে ইসমাইলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

মামলার নথি অনুযায়ী, বসতঘর নির্মাণের জন্য জমি কিনতে ইসমাইলের কাছে ৫০ হাজার টাকা ধার চেয়েছিলেন শান্তা ও সুমন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁর সঙ্গে তাঁদের তর্ক হয়। একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে ইসমাইলকে হত্যা করা হয় বলে তদন্তে উঠে আসে। মামলার এজাহারভুক্ত আসামি শান্তা বেগম (৩২) ও তাঁর স্বামী সুমন (৩৭) আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

এদিকে গত বছরের ১৬ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জনের স্বাক্ষরিত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। ২১ এপ্রিল সেটি গ্রহণও করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এরপর নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবেদনটি আশুগঞ্জ থানায় পাঠানো হলেও তদন্ত শাখায় তা পৌঁছেনি।

আশুগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) জানিয়েছেন, পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে পাঠানো ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন তদন্ত শাখায় পাওয়া যায়নি। মামলার বাদী সাদ্দাম অভিযোগ করেন, সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা এসআই কাজী ছানোয়ার হোসেন ও বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা এসআই দীপকের দায়িত্ব পালনে গাফিলতির কারণেই প্রতিবেদনটি তদন্তে ব্যবহার করা হয়নি।

তবে সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা এসআই কাজী ছানোয়ার হোসেন বলেন, পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনটি আশুগঞ্জ থানায় পাঠানো হয়েছিল। এরপর কী হয়েছে, তা তিনি জানেন না।

বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা এসআই দীপক বলেন, প্রায় সাত মাস আগে তিনি মামলার তদন্তভার পেয়েছেন। আগের তদন্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে পাওয়া নথিতে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনটি ছিল না। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ে যোগাযোগ করে প্রতিবেদনটি সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

নিহতের ছেলে সাদ্দাম বলেন, ‘বাবাকে হারিয়েছি। এখন শুধু বিচার চাই। কিন্তু এতদিনেও চার্জশিট হচ্ছে না। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট কোথায়, সেটাও জানি না।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উবায়দুর রহমান বলেন, বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights