মহাভোগান্তিতে বিমানযাত্রীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে গতকাল পর্যন্ত চার দিনে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও শাহ আমানত বিমানবন্দরে ১৮২টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে গতকাল ঢাকায় ৩৮ এবং শাহ আমানতে ৭টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়। এ ছাড়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মধ্যপ্রাচ্যের ছয় রুটের সব ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে। রুটগুলো হলো দাম্মাম, দোহা, দুবাই, আবুধাবি, শারজাহ এবং কুয়েত। বিমান জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিমানের এ ফ্লাইটগুলো স্থগিত থাকবে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থায় আকাশপথের চরম অস্থিতিশীলতার মধ্যে দুবাইয়ে আটকে পড়া ৩৯ জন পাইলট ও কেবিন ক্রুকে দেশে ফিরিয়ে এনেছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস।

একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় মহাভোগান্তিতে পড়েছেন বিমানযাত্রীরা। বিমানবন্দরে হাজার হাজার প্রবাসী দীর্ঘ প্রতীক্ষায় থাকছেন। সঙ্গে আছেন তাঁদের পৌঁছে দিতে আসা স্বজনরাও। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত যাত্রীরা ঢাকায় থাকবেন নাকি নিজ জেলায় ফিরবেন, সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। সরকারের পক্ষ থেকে যাত্রীদের জন্য নানান ব্যবস্থা নেওয়া হলেও সংকট কাটছে না। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের আকাশসীমা সাময়িক বন্ধসহ উদ্ভূত নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে ফ্লাইট বাতিল করা হচ্ছে। গতকাল দুপুরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যগামী অনেক যাত্রীকে বাড়ি ফেরত যেতে দেখা যায়। আবার অনেকে বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন। তাঁরা বলছিলেন, বাতিল হওয়া ফ্লাইট আবার কবে কখন চালু হবে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু জানেন না। তাই অপেক্ষা করছেন।

এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটে ভারতের মুম্বাই, ওমানের মাসকাট হয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে যাওয়ার কথা ছিল বাংলা?দে?শি অনেক যাত্রীর। বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটের ফ্লাইট ধরতে ভো?রে চ?লে আসা যাত্রী?দের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। বিমানবন্দরে বোর্ডিং পাসের সময় বলা হয়-যাওয়া যাবে না।

এ সময় দুবাইগা?মী যাত্রী দীপু চন্দ্র শীল সাংবা?দিক?দের বলেন, ‘মৌলভীবাজার ট্রাভেলস থেকে টিকিট নিয়েছি। সোমবার রাতেও তারা বলেছে, যাওয়া যাবে। কিন্তু এখানে আসার পর আমাকে বলা হয়েছে, যাওয়া যাবে না। আমার ফ্লাইট নাকি ইন্ডিয়ার পর আর মাসকাট যাবে না। ফ্লাইট বাতিল বলতেছে।’

একই অবস্থা কাতার এয়ারলাইনসের ফ্লাইটেও। কাতার হয়ে যাঁরা সৌদি আরবের রিয়াদ যাওয়ার কথা, তাঁদের ফ্লাইট বাতিল করা হ?য়ে?ছে। এ সময় রফিকুল ইসলাম না?মে কাতার এয়ারলাইনসের এক যাত্রী বলেন, ‘সৌদি আরবে কাজ ক?রি, ২৫ ফেব্রুয়ারি দেশে এসেছিলাম। ১৭ মার্চ পর্যন্ত ভিসার মেয়াদ আছে। আসার সময় আপ-ডাউন টিকিট কেটে দিয়েছিল কোম্পানি। ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় এখন কোম্পানির পক্ষ থেকে রিয়াদগামী বিকল্প উড়োজাহাজে টিকিটের ব্যবস্থার চেষ্টা চলছে। শেষ পর্যন্ত যেতে পারি কি না জা?নি না।’

এভাবে ইরানের স?ঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে। ফ্লাইট বাতিলের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন মধ্যপ্রাচ্যগামী যাত্রীরা। আগাম ফ্লাইট শি?ডিউল বাতিল ঘোষণা না করায় এক ?দিন আগে টিকিট কি?নেও যাত্রীরা বিপা?কে পড়ছেন। তাঁ?দের অভি?যোগ, ফ্লাইট বা?তিল হ?লে আগে ঘোষণা করা উচিত। হয়রা?নি ব?ন্ধে তাঁরা বিমান কর্তৃপ?ক্ষের হস্ত?ক্ষেপ কামনা ক?রে?ছেন।

জানা গেছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষাপটে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা বন্ধের ঘোষণা দেয়। ফলে দক্ষিণ এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়। বিমানবন্দর সূত্র জানান, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২৩টি ফ্লাইট বাতিল হয়। ১ মার্চ এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০-এ। ২ মার্চ ৪৬টি ফ্লাইট বাতিল হয়। আর গতকাল মধ্যরাতের পর বিভিন্ন এয়ারলাইনস আরও ৩৮টি ফ্লাইট বাতিল করেছে।

গতকাল বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে কাতার এয়ারওয়েজ, এমিরেটস, গালফ এয়ার, ফ্লাইদুবাই এবং ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের চারটি করে ফ্লাইট। এ ছাড়া কুয়েত এয়ারওয়েজের দুটি, জাজিরা এয়ারওয়েজের চারটি এবং এয়ার অ্যারাবিয়ার ১২টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে ফ্লাইট পরিচালনা অব্যাহত থাকবে। উপসাগরীয় অঞ্চলের রুটগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যা ইউরোপ, আমেরিকা ও অন্যান্য গন্তব্যে ভ্রমণকারী বাংলাদেশি যাত্রীদের জন্য প্রধান ট্রানজিট হাব হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

৩৯ পাইলট ও কেবিন ক্রুকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থায় আকাশপথের চরম অস্থিতিশীলতার মধ্যে দুবাইয়ে আটকে পড়া ৩৯ জন পাইলট ও কেবিন ক্রুকে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে দেশে ফিরিয়ে এনেছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস।

দীর্ঘ ৪৮ ঘণ্টার বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকার পর একটি বিশেষ ফ্লাইটে তাঁদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা হয়। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দুবাই থেকে ছেড়ে আসা এটিই ছিল একমাত্র বাংলাদেশি ফ্লাইট।

জানা গেছে, আকাশপথের সীমাবদ্ধতার কারণে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বোয়িং ৭৩৭ (ফ্লাইট ইঝ৩৪৪) দুবাইয়ে অবস্থান করতে বাধ্য হয়। সে সময় দুবাই বিমানবন্দরের কার্যক্রম সীমিত থাকায় ৩৯ জন পাইলট ও কেবিন ক্রু সেখানে আটকা পড়েন। পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় ইউএস-বাংলার দুবাই স্টেশন ও ঢাকা প্রধান কার্যালয় দুবাই বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে একটি নিরাপদ করিডর নিশ্চিত করার চেষ্টা চালায়।

অবশেষে স্বল্প সময়ের জন্য বিশেষ অনুমতি পাওয়া গেলে, সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় যাত্রীবিহীন ফ্লাইটে ওই ৩৯ জনকে নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশে উড্ডয়ন করে বিমানটি। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিকূল ও অনিশ্চিত সময়েও যাত্রী, পাইলট ও ক্রুদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সঠিক সমন্বয় ও অকুতোভয় দায়িত্ববোধের কারণেই এ উদ্ধার অভিযান সফল হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights