মাছের আঁশে স্বপ্ন বোনা

খন্দকার একরামুল হক সম্রাট, কুড়িগ্রাম

মাছের আঁশ সাধারণত উচ্ছিষ্ট বা বর্জ্য হিসেবে বিবেচনা করে ফেলে দেওয়া হয়। অথচ মাছের আঁশই কয়েক বছর ধরে কুড়িগ্রামে মূল্যবান পণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর কয়েকশ মণ মাছের আঁশ রপ্তানি করে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন জেলার বেশ কিছু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। মাছের আঁশ সংগ্রহ করে বাড়তি রোজগারের পাশাপাশি অনেকের কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হয়েছে। রুই, কাতলা, মৃগেল, কার্প, ইলিশসহ হরেকরকম মাছের আঁশের চাহিদা তুলনামূলক বেশি। শুধু আঁশ নয়, মাছের পেটে ফুলকা, কানসহ ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট অংশেরও চাহিদা রয়েছে। বড় মাছের আঁশ সংগ্রহ করার পর সেগুলো পানিতে অথবা গরম পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়। এরপর রোদে শুকিয়ে ঝরঝরে করে বিক্রির উপযোগী করে তোলা হয়। বছরে দুই থেকে তিনবার এই আঁশ বিক্রি করা হয়। এগুলো পাইকাররা কিনে দেশের বাইরে পাঠান। প্রতি মণ আঁশ বিক্রি করা হয় দুই হতে ৪ হাজার টাকায়। শুধু আঁশ নয় মাছের নাড়িভুঁড়িও বিক্রি হয়। নাড়িভুঁড়ি ব্যবহার করা হয় মাছের খাদ্য হিসেবে। মাছের জাত অনুযায়ী আঁশের দাম ভিন্ন হয়। মাছের আঁশে প্রচুর পরিমাণে ‘কোলাজেন’ থাকে। যা খাদ্য, ওষুধ, ফুড সাপ্লিমেন্ট, কসমেটিক্স, ওষুধ, ক্যাপসুলের খোসা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়াও ব্যাটারি, কৃত্রিম কর্নিয়া, বায়ো পাইজোইলেকট্রিক ন্যানো জেনারেটর, রিচার্জেবল ব্যাটারিতে চার্জ দেওয়া, ব্যাটারি তৈরি, বৈদ্যুতিক পণ্যসহ পোলট্রি খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এশিয়ার চীন জাপানসহ ইউরোপেরও বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করার সুবাদে দিনদিন এটি লাভজনক খাতে পরিণত হচ্ছে। মাছের আঁশ সংগ্রহের সঙ্গে অনেক মানুষ এখন এ কাজে যুক্ত হয়েছেন। তারা বাজার থেকে আঁশ সংগ্রহ করে বিক্রি উপযোগী করেন। মাছের আঁশ স্থানীয় পর্যায়ে ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে করে মাছকাটা শ্রমিকরা বাড়তি আয় করছেন। ঢাকা, রংপুর, কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার পাইকারের নিকট মাছের শুকনা আঁশ কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি করা হয়ে থাকে। জেলার রাজারহাট উপজেলার সুনীল চন্দ্র এবং দীলিপ কুমার বলেন, ‘মাছের ব্যবসা করি দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু মাছের আঁশের ব্যবসা গত বছর থেকে শুরু করেছি। এর আগে এই আঁশ ফেলে দেওয়া হতো। কিন্তু বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আরডিআরএস বাংলাদেশের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ পেয়ে এখন আর মাছের আঁশ ফেলে দেই না। প্রতিদিন মাছ কাটার আগে আঁশ ছাড়িয়ে নিয়ে এরপর তা সংগ্রহ করে সেগুলো শুকাই। এগুলো বছরে দুই থেকে তিনবার বিক্রি করে থাকি। মাছের আঁশ কিনতে খরচ হয় ২০ থেকে ২৫ টাকা। মাছের আঁশ শুকিয়ে যা পাওয়া যায় সেগুলো ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি করে থাকি। এতে আমাদের বাড়তি আয় হচ্ছে মাছের ফেলে দেওয়া আঁশ থেকে। আমি মনে করি, এটি ভালো লাভজনক ব্যবসা।’ শহরের খলিলগঞ্জের মাছ ব্যবসায়ী পূর্ণ চন্দ্র দাস বলেন, ‘বর্তমানে বড় মাছের আঁশ সংগ্রহ করে থাকি। এক মাসে ২০ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত মাছের আঁশ হয়। এগুলো ধোয়ামোছা ও শুকিয়ে বছরে তিনবার বিক্রি করি। শুধু মাছের আঁশ নয়, মাছের নাড়িভুঁড়ি, পাখনা, মাছের পেটে থাকা বেলুন, মাছের কানকো বিক্রি করে থাকি।’ জিয়া বাজারের মাছ কাটা শ্রমিক সজীব মিয়া বলেন, ‘দিনে বাজারে দুই থেকে চার মণ পর্যন্ত মাছ কাটা হয়। সেই মাছের আঁশ আগে আমরা শ্রমিকরা ফেলে দিতাম। এখন আর দেই না। বিভিন্ন মহাজনের কাছে সেই আঁশগুলো বিক্রি করে বাড়তি টাকা আয় হচ্ছে। এটা আগে জানতাম না।’ আরডিআরএস বাংলাদেশের এগ্রিকালচার ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র ম্যানেজার মশিউর রহমান বলেন, ‘আরডিআরএস বাংলাদেশের সহায়তায় প্রায় দুই বছর ধরে জেলার দুটি উপজেলায় ছয়জন মৎস্যজীবীকে পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। উচ্ছিষ্ট মাছের আঁশ সদস্যদের মাধ্যমে সংগ্রহ করে পাইকারের মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। জেলার অন্যত্র ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কাজ চলছে।’ এ ব্যাপারে কুড়িগ্রাম মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘মাছের আঁশ শিল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ছাড়াও বিশ্বে বিভিন্ন পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে মাছের আঁশ ব্যবহৃত হয়। সম্ভাবনাময় এই খাত ক্ষুদ্র থেকে মাঝারি শিল্পে পরিণত হতে যাচ্ছে। এজন্য মৎস্য বিভাগ মাছের আঁশের গুণগত মান ঠিক রাখতে কাজ করছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights