মাদরাসায় জ্বলে ধর্মের বাতি

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

‘যুদ্ধের সময় বিশ্বাসীদের সবার একসঙ্গে অভিযানে বের হওয়া সমীচীন নয়। প্রত্যেক সম্প্রদায় থেকে একটি অংশ অবশ্যই যুদ্ধযাত্রা থেকে বিরত থেকে আল্লাহপ্রদত্ত ধর্মবিধান সম্পর্কে গভীর জ্ঞানলাভে নিজেদের নিয়োজিত রাখবে। এ জ্ঞানীরাই যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা যোদ্ধাদের নৈতিক সত্যজ্ঞানে সচেতন করে তুলবে। ফলে তারা অন্যায় থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে (সুরা তাওবা-১২২)।’ মুফাসসিরগণ বলেছেন, এ আয়াতে আল্লাহতায়ালা দীনি এলেম অর্জনকে জিহাদের ওপর স্থান দিয়েছেন। এ থেকেই বোঝা যায়, ইসলাম ধর্ম এলেম অর্জনকে কত গুরুত্ব দিয়েছে। সশস্ত্র জিহাদের মাধ্যমে জীবন-সম্পদ ও ভূখণ্ড রক্ষা হয়। আর এলেমের মাধ্যমে ইমান-নৈতিকতা এবং তাকওয়া রক্ষা হয়। তাই কোরআন বলেছে, যখন কোথাও অভিযান পাঠানোর প্রয়োজন হয় তখন সবাইকে একসঙ্গে না পাঠিয়ে একটি দলকে এলেম অর্জনের জন্য পাঠিয়ে দাও। মুজাহিদরা তরবারির মাধ্যমে দীনের কাজ করবে আর আলেমরা তাকওয়া শেখানোর মাধ্যমে দীন রক্ষা করবে। শুধু জিহাদ নয় এলেমের মর্যাদা যে কোনো আমলের চেয়ে দুই কারণে বেশি। প্রথমত এলেম অর্জন করা স্বতন্ত্র একটি আমল। দ্বিতীয়ত এলেম ছাড়া কোনো আমল জানা সম্ভব নয়। তাই জগতের যাবতীয় আমল এলেমের কাছে ঋণী। এ কারণে পবিত্র কোরআনের শুরুই হয়েছে এলেম অর্জনের নির্দেশ দিয়ে- ‘ইকরা’। পড়ো। এলেম অর্জন করো। দীনি এলেম অর্জন করার প্রাচীন ও গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠান হলো মাদরাসা ও খানকাহ। মাদরাসায় শেখানো হয় শরিয়ত। আর খানকায় শেখানো হয় মারেফাত। খানকাও এক ধরনের মাদরাসা। তবে এটাকে আমরা উচ্চস্তরের মাদরাসা বলতে পারি। অবশ্য অতীতে খানকাই ছিল দীনি এলেম শেখার পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান। এলেমের মর্যাদা বর্ণনা করতে গিয়ে জ্ঞাননগরীর দরজা মাওলা আলী (রা.) বলেন, যার বুকে এলেম আছে তার কোনো ভয় নেই। সম্পদ একসময় শেষ হয়ে যায়, হারিয়ে যায়, চুরি হয়ে যায়। কিন্তু এলেম কখনো শেষ হয় না, হারিয়ে যায় না এবং চুরি যাওয়ার ভয় থাকে না। সম্পদশালী লোক সব সময় ভয়ে থাকে তার সম্পদ খোয়া যাবে অথবা সম্পদের কারণে তার জীবন বিপন্ন হতে পারে। কিন্তু এলেমের সম্পদ নিয়ে আলেম গভীর জঙ্গলে একাকী হাঁটলে তার কোনো ভয় থাকে না।

বলছিলাম এলেম শেখানো হয় মাদরাসায়। ভারতীয় উপমহাদেশে তিন ধরনের মাদরাসার প্রচলন দেখা যায়। আলিয়া নেসাব, কওমি নেসাব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস। সর্বপ্রথম ১৭৮১ সালে মুসলমানদের শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে কলকাতা আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা হয়। পরবর্তী সময়ে এর একটি অংশ ঢাকায় স্থানান্তরিত হয় ঢাকা আলিয়া মাদরাসা নামে। প্রায় ১০০ বছর পর ১৮৬৬ সালে দেওবন্দ নামে ভিন্ন ধারার একটি মাদরাসা চালু হয় উপমহাদেশে। দেওবন্দ মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ৯ বছর পর ১৮৭৫ সালে স্যার সৈয়দ আমহদ খান আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সে ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও আলিয়া, কওমি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলাম শিক্ষা বিভাগে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হয়। তবে বহির্বিশ্বে আরও আধুনিক এবং উন্নত পদ্ধতিতে দীন শেখানোর ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশের কোথাও কোথাও মদিনা ও আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস অনুসরণ করে বেশ কিছু মাদরাসা গড়ে উঠছে। মোট কথা, মাদরাসা শিক্ষাই বর্তমান বিশ্বে কোরআন-সুন্নাহ, হুব্বে রসুল (সা.), শানে আউলিয়ার বাতি জে¦লে রেখেছে। যেদিন পৃথিবীর বুক থেকে মাদরাসা বন্ধ হয়ে যাবে, সেদিন হুব্বে রসুল আর শানে আউলিয়ার চর্চাও বন্ধ হয়ে যাবে। তাই দীনের স্বার্থেই ধর্মের বাতি জে¦লে রাখা এই মাদরাসাগুলো টিকিয়ে রাখা জরুরি। এ জন্য আখেরাতে অভাবনীয় মর্যাদার কথাও ঘোষণা করেছেন নূর নবীজি (সা.)।

মাদরাসায় যারা কোরআনের চর্চায় লিপ্ত থাকে আল্লাহর রসুল (সা.) তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ বলেছেন। বুখারির বর্ণনায় এসেছে, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি যে কোরআন শিক্ষা করে এবং শিক্ষা দেয় (বুখারি)।’ যারা মাদরাসায় যাওয়ার জন্য পথে বের হয় তাদের সম্পর্কে নবীজি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এলেম শিক্ষার জন্য পথে বের হয় আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন (মুসলিম)।’ আরেক হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এলেম অনুসন্ধানে বের হয়েছে, সে ফিরে আসা পর্যন্ত আল্লাহর রাস্তায় থাকে (তিরমিজি)।’ তবে দীনের জ্ঞান সবার ভাগ্যে জোটে না বরং যার কপাল আল্লাহ খুলে দেন তাকেই তিনি মাদরাসার বারান্দায় নেন। এ সম্পর্কে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ যাকে অভাবনীয় কল্যাণ দিতে চান তাকে ধর্মের প্রজ্ঞা দান করেন (বুখারি)।’

পীর-মাশায়েখরা বলেন, মাদরাসায় পড়ে আল্লাহর কাছে সঠিক মর্যাদা লাভের জন্য শর্ত হলো ইখলাছ। শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মাদরাসায় পড়তে হবে। পার্থিব কোনো উদ্দেশ্যে মাদরাসায় ভর্তি হওয়া যাবে না। পার্থিব সুনামন্ডসুখ্যাতির উদ্দেশ্যে দীনি এলেম অর্জন করা হলে তার পরিণাম হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। হাদিসে এসেছে, জাহান্নামে সর্বপ্রথম নিক্ষিপ্ত তিন ব্যক্তির একজন হবে ওই আলেম, যে লোকের কাছে আলেম হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার জন্য এলেম চর্চা করেছে। অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, ‘যে দুনিয়াবি স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে এমন এলেম শিখল, যা শুধু আল্লাহর জন্যই শেখার কথা ছিল, কেয়ামতের দিন সে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না (আবু দাউদ)।’

লেখক : প্রিন্সিপাল, সেইফ এডুকেশন ইনস্টিটিউট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights