মানুষ গুমের ভয়ংকর পদ্ধতি

নিজস্ব প্রতিবেদক
গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন শনিবার প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। গতকাল প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে ওই প্রতিবেদনের কিছু অংশ প্রকাশ করা হয়। এতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার গুম ও নির্যাতন করার পদ্ধতির কিছু বর্ণনা আছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুম হওয়া বেশির ভাগ ব্যক্তিকে হয় হত্যা করা হয়েছে অথবা মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।

আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ শিরোনামে জমা দেওয়া রিপোর্টে কমিশন সদস্যরা ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে পাওয়া ১ হাজার ৬৭৬টি অভিযোগের মধ্যে ৭৫৮ জনের অভিযোগ যাচাইবাছাই করেন। কমিশনের এই অন্তর্র্বর্তী প্রতিবেদনে বিস্তারিত অবশ্য প্রকাশ করা হয়নি। এতে বলা হয়, কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে অপহরণ, আটক, নির্যাতন, হত্যা ও মুক্তির বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হবে।

গুমের ঘটনায় নির্দেশদাতা হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে কমিশন। এ ছাড়া হাসিনা প্রশাসনের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার গুমের ঘটনায় সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। যাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং পুলিশ কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলাম ও মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কমিশন গুমের পর মেরে ফেলার পদ্ধতি সম্পর্কে যাচাইকৃত বিস্তারিত প্রতিবেদন পেয়েছে। একটি কার্যকর পদ্ধতি হলো মাথায় গুলি করা। এরপর লাশ সিমেন্টের ব্যাগ দিয়ে বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া। র‌্যাবে কর্মরত সামরিক কর্মকর্তারা এই পদ্ধতিকে লাশ ডুবিয়ে দেওয়ার আদর্শ পদ্ধতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। হত্যার উপযুক্ত স্থান হিসেবে বুড়িগঙ্গা নদী, শীতলক্ষ্যা নদী (কাঞ্চন সেতু) এবং পোস্তগোলা সেতুর কাছাকাছি এলাকার উল্লেখ আছে। সুন্দরবনের জলদস্যুদের কাছ থেকে জব্দ করা একটি নৌকার উল্লেখ আছে প্রতিবেদনে যেটি পোস্তগোলা সেতুর কাছে রাখা হয়েছিল।

প্রতিবেদনে র‌্যাবের এক ব্যাটালিয়ন কমান্ডারের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। তার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, র‌্যাবের তৎকালীন গোয়েন্দা প্রধান পরিচালিত একটি সেশনে ‘র‌্যাবে ঢোকার অংশ হিসেবে’ একটি সেতুতে দুজনকে হত্যা করা হয়েছে। র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগে নিযুক্ত আরেক সৈনিকের বরাতে এতে বলা হয়, এক ভুক্তভোগী নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তাকে নদী থেকে উঠিয়ে আনা হয় এবং পরে ঘটনাস্থলেই হত্যা করা হয়।

একটি ঘটনায় বলা হয়েছে, সাদা পোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি ধানমন্ডি এলাকা থেকে এক যুবককে তুলে নিয়ে তার ঠোঁট অবশ করা ছাড়াই সেলাই করে দেয়। আরেকটি ঘটনায় বলা হয়েছে, এক ব্যক্তিকে আটক করে যৌনাঙ্গ এবং কানে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে, এক সেনা সদস্য জানান, তাকে একটি লাশ নিয়ে ঢাকার রেললাইনের ওপরে রেখে ট্রেনের অপেক্ষা করতে বলা হয় যেন ট্রেনের চাপায় লাশটি ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কমিশনের তদন্ত, ঘটনায় সম্পৃক্ত কর্মকর্তা ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের বয়ানে উঠে এসেছে গুম ও নির্যাতনের এসব রোমহর্ষক বর্ণনা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাউকে গুম করার ক্ষেত্রে দুই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। অনেক সময় প্রথমে কাউকে আটক করে নির্যাতন করে অন্যদের নাম আদায় করা হতো। এরপর তাদেরও ধরে এনে নির্যাতন করা হতো। পরে এদের সবাইকে গুম করা হতো। এ ছাড়া রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি বা নেতার সরাসরি নির্দেশেও গুম ও নির্যাতন করা হতো। এরপর টার্গেট করা ব্যক্তিকে অপহরণ করা হতো। অপহরণকারীরা নিজেদের ‘প্রশাসনের লোক’ বা আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সদস্য হিসেবে পরিচয় দিতেন। অপহরণের ঘটনা ঘটত সাধারণত রাতের বেলা।

আটক করার পর ভুক্তভোগীদের সাধারণত গোপন অন্ধকার কক্ষে রাখা হতো এবং সেখানেই তাদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতন চালানো হতো বলে অভিযোগ করেছে কমিশন। আটক অবস্থায় ভুক্তভোগীদের ওপর নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের বর্ণনা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কিছু নির্যাতনের ধরন ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ, যেমন পেটানো, বৈদ্যুতিক শক দেওয়া। এমন কয়েকজন ভুক্তভোগীর সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে কমিশন বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে এমন আটটি গোপন কারাগারের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights