মার্কিন অর্থনৈতিক যুদ্ধে যোগ দিলেই পাল্টা ব্যবস্থা, বিশ্বকে হুঁশিয়ারি ইরানের

অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ কোনও দেশ যোগ দিলে তাদের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান।

দেশটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা বিধিনিষেধ কার্যকরে সহযোগিতা করা যেকোনও দেশকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করবে তেহরান এবং প্রয়োজন হলে ওই দেশের স্বার্থে ‘ভূমিকম্পের মতো’ প্রতিক্রিয়া দেখানো হবে।

ইরানের এই হুঁশিয়ারির মধ্যেই কূটনৈতিক পথে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে মিসর।

শনিবার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাদর আবদেলাত্তি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে ফোনে কথা বলে চলমান সংঘাতের অবসানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পুনরায় শুরু করার ওপর গুরুত্ব দেন।

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই শনিবার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ যোগ না দিতে বিশ্বের সব দেশ, বিশেষ করে ইরানের প্রতিবেশীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

তিনি বলেন, “যেকোনও দেশ আমাদের ওপর অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ আরোপে অংশ নিলে তাকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে।”

এমন পরিস্থিতিতে ইরান ‘ভূমিকম্পের মতো’ পাল্টা জবাব দেবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

রেজাই জানান, এ ক্ষেত্রে ইরানের কৌশল হবে তিন ধাপে। প্রথমে উত্তেজনা কমাতে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে তাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে সরে থাকার আহ্বান জানানো হবে। তারা এতে সাড়া না দিলে শেষ পর্যন্ত সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং ওই দেশের স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

রেজাইয়ের ভাষায়, “আমরা প্রথমে তাদের সঙ্গে আলোচনা করব। তাদের বলব, সরে দাঁড়াতে এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে। কিন্তু তারা যদি পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে আমরা আঘাত করব। আমরা ওই দেশের স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করব।”

ইরানের এই হুঁশিয়ারি এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন অর্থনৈতিক চাপের ঘোষণা দেওয়ার কয়েক দিন পর। ট্রাম্প এর আগে ইরানের বিরুদ্ধে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সবচেয়ে ‘কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান’ চালানোর ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে ইরানকে যেকোনও ধরনের অর্থনৈতিক সহায়তা বা ‘লাইফলাইন’ দিলে সংশ্লিষ্ট দেশকে ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি’র মুখোমুখি হতে হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।

পরদিন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও একই সুরে হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, “আপনি হয় আমাদের সঙ্গে, নয়তো আমাদের বিরুদ্ধে।”

ইরানের সমুদ্রপথে রফতানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশের বেশি যে চীন কিনে থাকে, সেই চীনের কাছ থেকেও সহযোগিতা চান বেসেন্ট। সোমবার নতুন নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত ঘোষণা করার কথা রয়েছে তার।

নতুন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তেহরানের ক্ষোভ
নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার আগে শনিবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ওয়াশিংটনের পদক্ষেপের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, অন্য দেশের ওপর এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপ কার্যত জাতিসংঘের প্রতিটি স্বাধীন সদস্য রাষ্ট্রের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘বহির্মুখী সার্বভৌমত্ব’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বাঘাই বলেন, এ ধরনের ‘সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা’র আন্তর্জাতিক আইনে কোনও ভিত্তি নেই।

এদিকে যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে। একই সময়ে কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত এই জলপথ ইরান অবরোধ করে রেখেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ হামলা শুরুর পরপরই তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে তেল ও সারসহ বিভিন্ন পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি ঘটে।

তবে শনিবার ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানায়, বিশেষ অনুমতি নিয়ে ইরাকি তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

তবু প্রণালিটির সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত। ইরানের বক্তব্য, দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত থাকলেও রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনও সমঝোতা হয়নি।

কূটনৈতিক পথে ফেরার আহ্বান মিসরের
এমন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও কূটনৈতিক পথে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে মিসর।

মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাদর আবদেলাত্তি ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ফোনে আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং উত্তেজনা প্রশমনের পরিবেশ তৈরিতে চলমান প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

দুই মন্ত্রী ‘কূটনৈতিক পথে ফিরে আসার’ প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। এর মধ্যে ওমানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করা এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার বাস্তবায়ন ফের চালু করার বিষয়ও রয়েছে।

মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে একটি ‘ব্যাপক ও টেকসই সমঝোতা’ অর্জন করা, যা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উদ্বেগের সমাধান করবে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদার করবে।

আলোচনায় আরাগচি ইরানের দৃষ্টিতে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ, চলমান আলোচনা এবং আলোচনার পথে থাকা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অবহিত করেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

এর পর আরাগচি নিশ্চিত করেন যে, তিনি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গেও ফোনে কথা বলেছেন। ওই আলোচনায় পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা জোরদারে ‘কার্যকর সমাধান’ খোঁজার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

ইরানের সর্বশেষ হুঁশিয়ারি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন একদিকে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে সংঘাতের অবসানে কূটনৈতিক উদ্যোগও এখনও কোনও দৃশ্যমান সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। ফলে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ ও পাল্টা নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কাও ক্রমেই বাড়ছে। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights