মার্কিন চাপে মহা-লোকসান, ইরানের চাবাহার বন্দর ছাড়ছে ভারত?

অনলাইন ডেস্ক
ইরানের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ চাবাহার বন্দর নিয়ে ভারতের দীর্ঘ এক দশকের বিনিয়োগ ও স্বপ্ন এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের হুমকির মুখে নয়াদিল্লি এই প্রকল্প থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। যদিও ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে পিছু হটার কথা ঘোষণা দেয়নি। তবে পর্দার আড়ালে ঘটা একের পর এক ঘটনাপ্রবাহ ভিন্ন ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

ইকোনমিক টাইমস বা ইটি ইনফ্রার চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ভারত এই বন্দরের উন্নয়নের জন্য নির্ধারিত প্রায় ১২ কোটি ডলারের সম্পূর্ণ আর্থিক প্রতিশ্রুতি ইতিমধ্যেই ইরানকে বুঝিয়ে দিয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে চাবাহারের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পুনরায় কার্যকর হওয়ার আগেই নয়াদিল্লি তড়িঘড়ি করে এই অর্থ স্থানান্তর সম্পন্ন করে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে ভারতের পক্ষ থেকে দায়বদ্ধতা চুকিয়ে ফেলার কৌশল হিসেবে দেখছেন। ইটি ইনফ্রার সম্পাদক পি মনোজের মতে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে পুরো অর্থ পরিশোধ করে দেওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং এটি প্রকারান্তরে এই প্রকল্পে ভারতের সংশ্লিষ্টতার ইতি ঘটারই ইঙ্গিত দেয়।

বর্তমানে ভারত এক কঠিন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সম্মুখীন। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাবাহারের জন্য আগামী ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত শর্তসাপেক্ষ ছয় মাসের ছাড় দিয়েছে, অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।

ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি আরও জটিল, কারণ দেশটি আগে থেকেই মার্কিন প্রশাসনের আরোপ করা ৫০ শতাংশ শুল্কের বোঝা বইছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির জন্য আলোচনা চালাচ্ছে। এমন অবস্থায় ইরানের একটি বন্দরের জন্য আমেরিকার মতো বিশাল বাজারের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া ভারতের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উন্নয়ন কাজের পাশাপাশি পরিচালনার ক্ষেত্রেও ভারত পিছু হটছে বলে খবর পাওয়া গেছে। চাবাহার বন্দর পরিচালনার দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ইন্ডিয়া পোর্টস গ্লোবাল লিমিটেডের সরকার মনোনীত পরিচালকরা ইতিমধ্যে পদত্যাগ করেছেন। মার্কিন দণ্ড থেকে কর্মকর্তাদের বাঁচাতে সংস্থার ওয়েবসাইটটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিছু সূত্র বলছে, ভারত এখন মার্কিন ট্রেজারি বিভাগকে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছে।

যদিও সাবেক কূটনীতিক অনিল ওয়াধওয়া মনে করেন, এটি ভারতের একটি কৌশলগত পিছু হটা বা সাময়িক সমন্বয় হতে পারে যাতে নিষেধাজ্ঞা চলাকালে কাজ পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে যায়। তার মতে, ভারত সবসময়ই জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার বাইরে একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে এলেও মার্কিন সম্পর্কের স্বার্থে অনেক সময় তা মেনে চলে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে জানিয়েছে, তারা এই বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় পৌঁছানোর জন্য পাকিস্তানের বিকল্প পথ হিসেবে চাবাহার এবং আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোর ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে এবং ট্রাম্পের মারমুখী বাণিজ্য নীতির সামনে ভারতের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা এখন গভীর সংকটে। শেষ পর্যন্ত চাবাহার নিয়ে ভারত কতদূর এগোতে পারবে, তা নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের আসন্ন দরকষাকষির ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights